নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী নারীরা কঠোর পরিশ্রম করে, মেধাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। তাদের অনেকে হতে পারেন অন্য অনেকের আদর্শ। তবে সরকার তারা দাবি জানান, নারী উন্নয়নে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য দুর্নিষ্ট বরাদ্দের। কারণ যথাযথ সুযোগ পেলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন তারা। প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
বাজেটে আমাদের জন্য কোন
কর্মসূচি নেই
—নাজমা আরা বেগম পপি
বাংলাদেশ ভিজুয়ালি ইম্পেয়ার পিপলস সোসাইটি
দেশে বর্তমানে অনেক প্রতিবন্ধী নারী আর্থিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সঙ্গে নিজেদের জড়িত করছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে বরাদ্দকৃত ১০০ কোটি টাকার মধ্যে এসব প্রতিবন্ধী নারী উদ্যাক্তাদের অন্তর্ভুক্তিকরণ একান্ত জরুরী। সমাজ সেবা অধিদপ্তর ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ দেয়। তবে তা এতো বেশি নিয়ম মেনে চলে যে, সেই জটিলতায় প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়, আর আজকের সময়ের প্রেক্ষাপটে টাকার পরিমাণও অনেক কম। আমি এই দুইটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই- জাতীয় বাজেটে কোন কর্মসূচিতে কোন বরাদ্দ নেই। নারী উন্নয়ন সম্পূর্ণ হবে না প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ব্যতীত।
সহজ সর্তে ঋণ দরকার
—তাহমিনা আক্তার
মহিলা ক্লাব, ময়মনসিংহ
১২০ প্রতিবন্ধী নারী আমার সাথে আছে। আমি তাদের টেইলারিং ,এম্ব্রয়ডারি, ব্লক বাটিক প্রশিক্ষণ দেই। তারা অনেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা করতে পারে না মূলধনের অভাবে। কোথায় গেলে তাদের ভাগ্য ফিরবে তাও তাদের জানা নেই। এমন নারীকে সমাজের বোঝা না করে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে সম্পদে সমৃদ্ধ করা যায়। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে যে ঋণ দেয়া হয় তা খুবই সামান্য। আবার আমি শুনেছি- দুই মাসের মধ্যেই ফেরত দিতে হয়। এমন হলে কিভাবে প্রতিবন্ধী নারী মূল ধারায় একীভূত হবে। আসলে সরকার যদি বাজেটে তাদের বিষয়টি নিয়ে আসে তবে অনেক সমস্যার সমাধান হবে।
জাতীয় নারী নীতি-২০১১-তে সুনির্দিষ্ট আছে, তারপরও কার্যকর হয় না
—মহুয়া পাল
ভাইস চেয়ারপারসন, অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন
সরকার দরিদ্র ও বেকার নারীকে কর্মমুখী করার লক্ষ্যে বিউটিফিকেশন ট্রেনি, কম্পিউটার ট্রেনিং, মোবাইল সার্ভিসিং ট্রেনিংসহ বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং দিচ্ছে। এরপর তাদের সহজশর্তে ঋণ প্রদান করছে। অনেক নারী আজ এর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হচ্ছে। এ সকল সুবিধার আওতায় প্রতিবন্ধী নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। তাদের অবস্থার উন্নয়নের সাথে সাথে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরো বাড়বে বলা যায়। জাতীয় নারী নীতি-২০১১-তে ১৬’ ১৭ ধারায় প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার রক্ষা করা এবং ৩৯-এর দ্বিতীয়ভাগে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করে সমাজের মূল ধারার একীভূত করার বিষয় বলা হয়েছে। এতে শিক্ষা ঋণ সুবিধা প্রদান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা, সরকারি-বেসরকারি ঋণ গ্রহণসহ প্রশিক্ষণ, বিপণনে অবাধ অংশগ্রহণসহ সকল বিষয়ই চলে আসে; কিন্তু তারপরও তা হচ্ছে না। তাদের পণ্য উত্পাদন ও বিক্রয়ে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক। প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের চলার পথ সুগম করতে সরকারকে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আর বাজেটে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব দেয়ার দাবি করি।
সম্মাননারও ব্যবস্থা করা জরুরি
—নার্গিস আক্তার শরিফা
নারী উদ্যোক্তা
শুধু তাই নয় বেসরকারি প্রচেষ্টাও প্রয়োজন। আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে একসেস বাংলাদেশ থেকে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কার পেয়েছি। এটা আমাকে অনেক অনুপ্রাণিত করে। আমার স্বামী আছে, সন্তান আছে। তাদের সাথে সুন্দর সংসার আছে যা সুন্দর করতে আমার কর্মদক্ষতাও ভূমিকা রাখে। তাই সরকারও বাজেটে প্রতিবন্ধী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করতে পারে। এর ফলে নারী স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমে পরিবার ও নিজেকে দারিদ্র্য দশা থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। দেশ এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে। প্রতিবন্ধী নারীকে উত্সাহিত করতে তাদের উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত করতে অগ্রধিকার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ দেয়া, এসএমই ফাউন্ডেশনকে নতুন ক্যাটাগরিতে ‘বর্ষ সেরা প্রতিবন্ধী নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কার চালু, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রধিকার প্রদান, সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী নারীর জন্য উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ও গুরুত্ব দিয়ে শুরু করতে হবে।