বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং মানবপাচার

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আয় করে এমন শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলারের রেমিটেন্স সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশের রেমিটেন্সের বেশিরভাগই প্রবাসীদের পাঠানো। এই রেমিটেন্স বাংলাদেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) প্রায় ১২ শতাংশ অবদান রাখছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রার উত্স প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ। গত অর্থ বছরে এর পরিমাণ ছিল অন্তত পক্ষে ১ লক্ষ ১০ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত দশ বছরে দেশে এসেছে প্রায় বিশ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের লাশ। এই লাশের দায় কেউ নেয়নি। এই মৃত্যুর একটা বড় অংশই অস্বাভাবিক। কর্মস্থলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে অসুস্থতা, বাসস্থান ও খাদ্য সংকট, কর্মস্থলে শারীরিক নিপীড়ন, স্থানীয় বাসিন্দাদের হামলা, গ্রেফতারের আতঙ্ক, উদ্বেগ—এসবই এই মৃত্যুর সারিকে দীর্ঘতর করেছে। গোপনে পাচারের সময়ে কত অজস্র বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন মালবাহী ট্রাকে বা জাহাজের খোলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে, জাহাজডুবিতে, সীমান্তরক্ষীর তাড়া খেয়ে বরফে জমে তার ইয়াত্তা নেই। এই মৃত্যুর সংখ্যা কত উদ্বেগজনক হারে প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে তা বোঝা যাবে একটি সরকারি তথ্য থেকেই। ২০০৮ থেকে ২০১৩, ছয় বছরে ৫৬টি দেশ থেকে লাশ এসেছে ১৩ হাজার ৮৭২ জন প্রবাসীর। এর আগে ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এসেছে ৬ হাজার ১৭টি লাশ। আরও আগে ২০০২ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬১৩ জন প্রবাসী শ্রমিকের লাশ আসার তথ্য আছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। এর পাশাপাশি রয়েছে মানবপাচার। বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষ পাচার করা হচ্ছে। চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে; অথবা পতিতাপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে এভাবে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে অনেকেরই। কোনো ব্যক্তিকে তার দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিক্রি বা পাচারের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করা হলে মানবপাচার হিসেবে গণ্য হবে।
মানব পাচাররোধে মানবপাচার আইন ২০১২-এর সঠিক প্রয়োগ এবং সরকারিভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে মানবপাচারের সংখ্যা কমে আসতে পারে বলে মনে করেন আইন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে ড. শাহদীন মালিক বলেন, ‘মানবপাচারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। মানবপাচার আইনের সঠিক ব্যবহার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তত্পর হলে মানবপাচার কমে আসবে।’ 
বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি এ বিষয়ে এ বলেন, ‘মানুষ অভাবের তাড়নায় নারী-পুরুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। কিন্তু দালালরা নারীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করছে বা বিক্রি করে দিচ্ছে। তাই প্রথমে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারিভাবে মানুষকে বিদেশে যাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে হবে। এ ছাড়া পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।’