নারী উদ্যোক্তাগণ ঋণখেলাপী নহেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সঠিক কথাই বলিয়াছেন: অনেক বড় বড় শিল্পপতি ঋণখেলাপী হন কিন্তু নারী উদ্যোক্তারা সাধারণত ঋণখেলাপী নন। ঋণ নিয়া তাহারা সঠিকভাবে কাজে লাগান এবং যথাসময়ে ফেরতও দেন। সমপ্রতি সিলেটে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন ও এসএমই ব্যাংকিং সেমিনারে তিনি কথাগুলি বলিয়াছেন। এই অভিজ্ঞতা কেবল তাহার নহে। সরকারি বেসরকারি সকল ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতাই তাহার মুখে উঠিয়া আসিয়াছে। এই কারণেই হয়তো তিনি নারীদের বিশেষ গুরুত্ব দিতেছেন এবং প্রতি বত্সর ১০ হাজার নূতন নারী উদ্যোক্তা তৈরির স্বপ্ন নিয়া আগাইতেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সকল তফসিলী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইউনিট গঠন করিয়াছেন এবং ইহাতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবে বলিয়া মনে করিতেছেন।

 
আমাদের অর্থ ও সম্পদ কম। তথাপি প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় উন্নয়নের অনেক সূচকে আমরা আগাইয়া আছি, জাতিসংঘের প্রতিবেদন সেই সাক্ষ্যই দিতেছে। এই ক্ষেত্রে নারীর অবদান বিপুল। কেবল গৃহস্থালীর অদৃশ্য অর্থনীতি নহে, দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ও কর্মসূচিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়িতেছে। নারী শ্রমিকদের কারণেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বৃহত্তর মার্কেট তৈরি হইয়াছে। শুধু দেশে নহে, নারীরা এখন বিদেশে গিয়াও কাজ করেন। পুরুষের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীর এইরূপ অংশগ্রহণ আমাদের অর্থনীতিতে বিশাল সহায়ক ভূমিকা রাখিতেছে। তাই নারীদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা ও ক্ষমতায়নে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলি ২০১৪ সালে প্রায় ৪১ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ঋণদান করিয়াছে। এইসব উদ্যোক্তা পাইয়াছেন ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি স্বল্প সুদের ঋণ। শুধু তাহাই নহে, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জয়িতা নামে একটি প্রকল্পও চালাইতেছে। ফলত, গত কয়েক বত্সরে গড়িয়া উঠিয়াছে সফল অনেক নারী উদ্যোক্তা, যাহারা আন্তর্জাতিকভাবেও সুনাম অর্জন করিয়াছেন। নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও কয়েকগুণ বাড়িয়াছে। কিন্তু তাহাদের বড় অংশটি যুক্ত হইয়াছেন ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে। বুটিক কিংবা বিউটি পার্লারের মতো সেবাখাতেই নারী উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য। তবে চিত্র বদলাইতেছে, গভর্নরের কথাতেই তাহা প্রতিফলিত। দেশের মোট শিল্প উদ্যোক্তার মধ্যে এখন ১০ শতাংশের বেশি নারী। তাহারা বুটিক, পার্লারের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোগ ছাড়িয়া চামড়া, হিমাগার, আইটিসহ নানামুখী ব্যবসায়িক ও শিল্প উদ্যোগেও যুক্ত হইতেছেন।
 

সন্তান ধারণ, জন্মদান ও বড় করিয়া তুলিবার জন্য প্রকৃতি নারীদেরকে যে ধৈর্য, কোমলতা, দায়িত্বশীলতা ইত্যাদি গুণে সৃজন করিয়াছে তাহাই উদ্যোক্তা হিসাবেও তাহাদেরকে পুরুষের তুলনায় অগ্রগামী করিয়া রাখিয়াছে। যাযাবর মানুষ থিতু হইয়া কৃষি সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়াছিল নারীদের কল্যাণেই; পুরুষ জানিয়া নিয়াছিল চাষাবাদের কলাকৌশল এবং আবাদযোগ্য শস্য ও বীজের খবরাখবর। উদ্যোক্তা হিসাবে আমাদের নারী সমাজের একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখিবার যোগ্যতা ও মেধাসম্পন্ন হইলেও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাবে এবং সাধারণভাবে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এখনও পিছাইয়া আছে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতির রঙিন সময় গড়িয়া তুলিতে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাইতেই হইবে, এমনকি তাহাদের কাছ হইতে শিখিতেও হইবে ঋণখেলাপী না হইয়া যথাযথ বিনিয়োগ ও স্বাবলম্বী হইবার কায়দা-কানুন।