আপন উদ্যোগে

পঞ্চগড় পৌরসভার তুলারডাঙ্গা গ্রামে নজরুল ইসলাম জনির বাড়ি। বয়স্ক নারী-পুরুষদের জন্য তিনি গড়ে তুলেছেন ‘আয়েশা ঈশা কাশেম দাদা বয়স্ক শিক্ষ কেন্দ্র’। সমাজের কল্যাণে বিরামহীনভাবে কাজ করে যাওয়ায় অনেক সফলতা পেয়েছেন এই তরুণ। তার পালকে সর্বশেষ যোগ হয়েছে ‘জয় বাংলা ইয়্যুথ অ্যাওয়ার্ড’। মানবসেবায় কাজ করে চলা এই তরুণের গল্প শোনাচ্ছেন আহসান রনি

 

ছেলে অসুস্থ। ওষুধ খাওয়াতে হবে। আশপাশে কেউ নেই যে সাহায্য নেবেন। গ্রামের নিরক্ষর মা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। একপর্যায়ে ওষুধ মনে করে ঘরে থাকা কীটনাশক ছেলের মুখে তুলে দিলেন। যখন বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ছেলে চলে গেছে না ফেরার দেশে। মর্মান্তিক এ ঘটনা প্রতিবেশী এক তরুণের মনে নাড়া দেয়। ওই তরুণ ভাবেন, ওই মা যদি লিখতে-পড়তে পারতেন, তবে হয়তো এমন ভুল করতেন না। এসব মানুষকে শিক্ষার আলো দেওয়ার ব্রত নেন তিনি। সেই ব্রত থেকেই গ্রামে একটি পাঠশালা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। গৃহশিক্ষকতা করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে যাত্রা শুরু সেই পাঠশালার, যেটির নাম দেন ‘আয়শা ঈশা কাশেম দাদা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র’। তরুণের নাম নজরুল ইসলাম জনি। পড়াশোনা করেছেন এইচএসসি পর্যন্ত। এরপর ওই স্কুল নিয়েই ব্যস্ত। শুরুর গল্প জানতে চাইলে জনি জানালেন, লেখাপড়া না জানায় গ্রামের সাধারণ মানুষ নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়, পাশাপাশি নিরক্ষরতার কারণে শিশু ও নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে, মাদকের ছোবল তো আছেই। বিষয়টি ভাবায় জনিকে। তিনি চিন্তা করেন, শিক্ষাই এর সমাধান। এসব নিয়ে আলোচনা করেন সহপাঠী একই গ্রামের জিয়াউর রহমান ও জেসমিন বেগমের সঙ্গে। তারা সিদ্ধান্ত নেন পাঠশালা গড়বেন। দুই বন্ধু মিলে ঠিক করেন, জনির বাড়ির পাশের সুপারির বাগানে গ্রামের নিরক্ষরদের পড়ানো হবে। জনি তাদের ইচ্ছার কথা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানান। নিরক্ষর নারী-পুরুষকে পড়তে আসার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু নারীদের ঘর থেকে বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা হাল ছাড়েননি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয় লেখাপড়া। প্রথমদিকে সেখানে পড়তে আসত মাত্র ১৮ থেকে ২০ জন। দুটি পালায় পড়ানো শুরু হয়। বিকেলে পড়েন নারীরা, রাতে পুরুষেরা। জনির প্রাইভেট পড়ানোর টাকায় কেনা তিনটি হারিকেন ও পাঁচ লিটার কেরোসিন তেল দিয়ে শুরু হয় রাতের পড়া। দিনের পালায় পড়ানো ভালোমতো চললেও রাতের পালায় সমস্যা হতো। কারণ, কেরোসিন কেনার খরচ কম নয়। জনির হার না মানা মানসিকতা দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামের কিছু মুরুব্বি। স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের বই, খাতা-কলম, চক-ডাস্টার, বসার চট, মোমবাতি-হারিকেনসহ প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা করেন। তারপরও যেন এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল না। জনির উদ্যোগের কথা জানতে পেরে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন, জনির বাড়ির উঠানে টিনের চালা করে বানানো হয় পাঠশালা। বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে তিন পালায় চলছে পাঠদান। দুপুরের পালায় পড়ানো হয় শিশুদের। বর্তমানে এ পালায় সুবিধাবঞ্চিত ৩৬টি শিশু পড়াশোনা করছে। বিকেলের পালায় পড়ছেন ৩০ জন নারী। আর রাতের পালায় পড়েন ২৫ থেকে ৩০ জন পুরুষ। কাউকে বেতন দিতে হয় না। পাঠশালার শিক্ষক বলতে জনি নিজেই। শিশুরা ছয় মাস এখানে পড়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। বয়সী নারী-পুরুষেরাও ছয় মাস এখানে পড়েন। ‘আয়শা ঈশা কাশেম দাদা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র’-এ পাঠশালায় লেখাপড়ার পাশাপাশি গ্রামের লোকজনকে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করে তোলেন জনি। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রথা রোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি, মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। বিপদে-আপদে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করা, সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তোলা, বাড়িতে ছোটখাটো খামার তৈরি, শাকসবজির বাগান, হাঁস-মুরগি-কবুতর, গরু-ছাগল পালনেও উদ্বুদ্ধ করেন।  ‘ছোটবেলায় পড়ালেখা করতে পারিনি। কম বয়সেই বিয়ে হয়। পড়াশোনার ইচ্ছা ছিল। এখন এই স্কুলে এসে পড়াশোনা করছি,’ বলছিলেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। সারা দিন খাটা-খাটুনির পর রাতের পালায় পড়তে আসেন মনজুর রহমান। ‘পড়াশোনা না জানলে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। এখন পড়তে ও লিখতে পারি,’ সরল উত্তর মনজুরের। জনির সহযোগী দিনার বলেন, ‘জনির মহত্ উদ্যোগ আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই ওর সঙ্গে যোগ দিই।’ আয়শা ঈশা কাশেম দাদা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র এরই মধ্যে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছে। সাক্ষরতাদানে বিশেষ অবদান রাখায় ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে জেলা প্রশাসন জনিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মাননা সনদ’ দিয়েছে। ‘ইয়্যুথ বাংলা’ সারা বাংলাদেশ থেকে মোট ৩০ জন তরুণকে পুরস্কার প্রদান করে ৬টি বিষয়ে, ‘আয়শা ঈশা কাশেম দাদা বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র’ শিক্ষা ক্ষেত্রে এই পুরস্কার লাভ করে। এখন এই স্কুলের পাশাপাশি আরও ৫টি স্কুল খোলা হয়েছে। বর্তমানে এই স্কুলে ৩৪০ জন ছাত্র/ছাত্রী শিশু, বয়স্ক নারী-পুরুষ অধ্যয়ন করছে। আর নতুন করে খোলা ৫টি শাখায় আছে ২১০ জন ছাত্র-ছাত্রী—শিশু, বয়স্ক নারী-পুরুষ। সবাইকে অধ্যয়নের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাও প্রদান করা হয়। এর মধ্য রয়েছে সেলাই কাজ, কম্পিউটার ট্রেনিং, হস্তশিল্প ইত্যাদি। জনি স্বপ্ন দেখেন, দেশের কোনো মানুষ অশিক্ষিত থাকবে না। আরও ৭টি এই ধরনের মডেল বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র খোলার আশা জনির। জনি জানান, যদি সমাজের দু-একজন সম্পদশালী, সমাজসেবী ব্যক্তি তাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন তাহলে তিনি সমাজের কল্যাণে আরও আদর্শ স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন।