বিয়ের টাকা জোগাড় করতে ভাবী ভাতিজিকে খুন করি

চাঞ্চল্যকর মা ও মেয়ে জোড়াখুনের ঘটনার ১৯ দিন পর হত্যাকারী মো. বেলাল হোসেন (১৯) পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। গ্রেফতার বেলাল নিহত নাসিমা বেগমের স্বামী শাহ আলমের আপন খালাতো ভাই। গত ৭ মে সকাল সোয়া ৯টায় নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়া এলাকার আল ইসলাম ভবনের চতুর্থ তলায় ভাই শাহ আলমের বাসায় প্রবেশ করে ভাবী নাসিমা ও ভাতিজি রিয়া আক্তার ফাল্গুনীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে বেলাল। এরপর বাসার আলমারি ভেঙে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোনসহ ২ লাখ ৭১ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে যায়। নাসিমার খোয়া যাওয়া দুই মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার নগরীর সদরঘাট এলাকা থেকে বেলালকে গ্রেফতার করে মহানগর ডিবি পুলিশ। এর মধ্যে টেলিভিশন সেট, সাউন্ড বক্স ও একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয় বেলালের কথিত প্রেমিকা ফারজানার বাসা থেকে। অপর মোবাইলটি উদ্ধার করা হয় বেলালের এর বন্ধুর কাছ থেকে।

 
বিয়ের টাকা জোগাড় করতেই খুন : পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল জানায়, ফারজানা নামের একটি মেয়ের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। কয়েকদিন পর তাদের বিয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু বিয়ে করার মত টাকা তার কাছে ছিল না। বেলালের মাসে মাত্র ৮ হাজার টাকার মত আয়। বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসায় সে টাকা জোগাড়ের ধান্দায় নেমে পড়ে। এক পর্যায়ে টাকার জন্য শাহ আলমের বাসায় ডাকাতি করার পরিকল্পনা করে। ঘটনার দুইদিন আগে শাহ আলমের বাসায় বেড়াতে এসে রাতে ওই বাসায় অবস্থান করে বেলাল। কৌশলে জেনে নেয় বাসার আলমারিতে টাকা ও স্বর্ণালংকার থাকার কথা। পরদিন বাসা থেকে বের হয়ে এক কসাইয়ের দোকান থেকে বড় একটি ছুরি সংগ্রহ করে শাহ আলমের বাসার কাছে এক ডাস্টবিনের মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
 
পরিকল্পনা অনুযায়ী ৭ মে সকাল সোয়া ৯টায় শাহ আলমের বাসায় যায় বেলাল। এসময় তার পরনে ছিল কালো প্যান্ট ও কালো শার্ট। রক্তের দাগ যাতে না বোঝা যায় সেজন্য কালো পোশাক পরে খুন করতে যায় বেলাল। শাহ আলমের দুই ছেলে রিয়াদ ও হূদয় তখন স্কুলে ছিল। তবে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় মেয়ে রিয়া সেদিন স্কুলে যায়নি। বাসার দরজা খোলা থাকায় বেলাল সহজেই ঘরে ঢুকে যায়। এসময় নাসিমা বেগম রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। বেলাল তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তলপেটে ছুরি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যেই নাসিমা মারা যান। মায়ের গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে বেডরুম থেকে বের হয়ে আসে ১০ বছরের রিয়া। বেলাল তাকে মুখ চেপে ধরে বাথরুমের         ভেতরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে হত্যা করে। এরপর বাসার আলমারি ভেঙে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ও মোবাইল ফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
 
খুন করার কিছুক্ষণ পর আবার ঘটনাস্থলে যায় বেলাল : ভাবী ও ভাতিজিকে খুন করে ঠাণ্ডা মাথায় ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয় বেলাল। বাসা থেকে বের হয়ে একটু দূরে ৭ তলা মাঠে যায় বেলাল। সেখানে টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার একটু গুছিয়ে নিয়ে চলে যায় একটি সেলুনে। এরপর আবার সে ফিরে যায় শাহ আলমের বাসায়। সেখানে গিয়ে এমন ভান করতে থাকে যেনো সে কিছুই জানে না। এক পর্যায়ে ভাবী ও ভাতিজির লাশ বাসা থেকে নামিয়ে আনতে পুলিশকে সহায়তা করে।
 
স্বর্ণ বিক্রয় করে প্রেমিকাকে টিভি উপহার : শাহ আলমের বাসা থেকে ডাকাতি করা স্বর্ণগুলো বেলাল বিক্রি করে বাকলিয়া থানার মিয়াখান নগর এলাকার আল নূর মার্কেটের মৌমিতা জুয়েলার্সের মালিক টিটু সাহার কাছে। এখান থেকে পাওয়া ৩৯ হাজার টাকা খরচ করে সে ১টি টিভি সেট, ১টি ডিভিডি প্লেয়ার, ২টি সাউন্ড বক্স কিনে প্রেমিকাকে উপহার দেয়। এছাড়া নাসিমার একটি মোবাইল ফোনও সে প্রেমিকাকে উপহার দেয়। ওই ফোনটি প্রেমিকা দেয় তার ভাইকে। আরেকটি মোবাইল বেলাল তার বন্ধু আশরাফুল আলম ভুঁইয়াকে দেয়। এভাবে সব গুছিয়ে আনার পর সে প্রেমিকাকে নিয়ে ফুর্তিতে মেতে ওঠে। দুইজনে মিলে শহরের ফয়’স লেকসহ নানা বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরতে থাকে।  
 
বেলালকে গতকাল বুধবার মহানগর ডিবি কার্যালয়ে সংবাদ মাধ্যমের সামনে উপস্থিত করা হয়। এসময় সিএমপির উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) কুসুম দেওয়ান সাংবাদিকদের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বেলালকে প্রথম থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তবে সে অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করার পরও তাকে ধরা যাচ্ছিল না। তবে নিহত নাসিমার ব্যবহূত দুইটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে এগুনোর পর বেলালকে আমরা শনাক্ত করতে সক্ষম হই।
 
সংবাদ সম্মেলনে মহানগর ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. তানভীর আরাফাত বলেন, গত সোমবার আমরা বেলালকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করি। কিন্তু সে কিছুতেই জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছিল না। তবে আমরা যখন জানতে পারি নাসিমার মোবাইল ফোন বেলালের বান্ধবীর কাছে রয়েছে তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
 

দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় পরিবার : গতকাল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নিহত নাসিমার স্বামী শাহ আলম ও দুই ছেলে রিয়াদ ও হূদয়। শাহ আলম ইত্তেফাককে জানান, বেলাল একসময় তার মাংসের দোকানে চাকরি করতো। কিন্তু কিছুদিন আগে সে চাকরি ছেড়ে অন্য একটি দোকানে ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি নেয়। তিনি বলেন, তার মেয়ে ও স্ত্রীকে বেলাল যেভাবে হত্যা করেছে তাকেও যেন সরকার একইভাবে নির্মম কষ্ট দিয়ে ফাঁসি দেয়।