দেশের মহাসড়কে ঘটছে বহুমাত্রিক অপরাধ। এরমধ্যে রয়েছে ডাকাতি, ছিনতাই, পণ্য চুরি এবং যাত্রী হয়রানি। কোন কোন ক্ষেত্রে মামলা হয়। তবে আসামি ধরা পড়ে না। গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ডাকাতি, চুরি (বিশেষ করে গার্মেন্টস) ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে ৮১টি।
তবে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা জানিয়েছেন, এ সংখ্যা দায়েরকৃত মামলার কয়েকগুণ বেশি। কারণ সড়কে চুরির ঘটনা ঘটলে পুলিশ মামলা নিয়ে চায় না। তারা জানান, গত এক মাসে ফরিদপুরের মধুখালী থেকে রাজবাড়ি মোড় এলাকায় কমপক্ষে ১০টি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। মামলা হয়েছে চারটি। আর যাত্রী হয়রানি— এটা একশ্রেণির পুলিশের মাধ্যমেই ঘটে থাকে। এক্ষেত্রে অভিযোগ শোনা বা জানানোর কোন সুযোগও নেই।
এ ব্যাপারে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে ডাকাতির সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমেছে। ফরিদপুরের মধুখালী থেকে রাজবাড়ি মোড় পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার নির্জন এলাকা হওয়ায় এখানে মাঝে মধ্যেই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। তবে সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনার পর থেকে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।
মহাসড়কের অপরাধীরা কেন গ্রেফতার হয় না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশ মহাসড়কের দুই পাশে ২০ ফুট পর্যন্ত যেতে পারে। মামলা হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার থানায় মামলা হয়। থানা পুলিশই মামলার তদন্ত করে। তবে তিনি বলেন, মহাসড়কে ডাকাতির সঙ্গে জড়িত অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা চট্টগ্রামসহ অন্যান্য সড়কে পণ্য পরিবহনের (বিশেষ গার্মেন্টস পণ্য) গাড়িতে চুরির ব্যাপারে ‘তিনি বলেন, ‘আমি হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এ ব্যাপারে লিখিত কোন অভিযোগ পাইনি। যা পেয়েছি মৌখিকভাবে। তারপরও হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বেশ কিছু মৌখিক অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করছি’।
তিনি বলেন, সামনে রোজা ও ঈদ। এটা মাথায় রেখেই হাইওয়ে পুলিশ কার্যক্রম শুরু করেছে। মঙ্গলবার তিনি হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে ৯ পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। বেনাপোল-ঢাকা মহাসড়কে বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রী হয়রানি সম্পর্কে তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশ কখনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোন গাড়ি তল্লাশি করে না।
মহাসড়কে অপরাধীরা কেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়– এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সদর দফতরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কে যারা অপরাধ করে তাদের শনাক্ত করা জটিল। থানায় পুলিশ মামলা করে। কিন্তু ডাকাতদের ব্যাপারে তথ্য না পাওয়ার কারণেই গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না। ঐ কর্মকর্তা বলেন, মহাসড়কের নিরাপত্তা হাইওয়ে পুলিশের। কিন্তু হাইওয়ে পুলিশের মামলা তদন্ত করার সুযোগ নেই।
একটি বিলাস বহুল পরিবহনের যশোর অফিসের ম্যানেজার বলেন, ঢাকা-যশোর রোডের ১২টি পয়েন্টে ভারত থেকে আসা যাত্রীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ নিয়ে বার বার পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করার পরও কোন প্রতিকার হয়নি। ১২টি পয়েন্টের মধ্যে ঝিকরগাছা উপজেলার আমরাখালি পয়েন্টে তল্লাশি করে বিজিবি। বিজিবি সব পরিবহনকে তল্লাশির ব্যাপারে আগে থেকেই অবহিত করে রাখে। ফলে প্রত্যেকটি পরিবহনের চালক এখানে এসে গাড়ি থামায়।
তিনি বলেন, তল্লাশিকালে কোন ধরনের সমস্যা হলে বিভিন্ন সময় বিজিবির কর্মকর্তাদের জানানো হয়। তারা দ্রুত বিষয়টি মীমাংসা করেন। কিন্তু পুলিশের হয়রানির ব্যাপারে কারো কাছেই অভিযোগ জানিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ১১টি পয়েন্টে পুলিশের তল্লাশির ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ধরনের তথ্য জানানো হয় না।
এগুলো হচ্ছে- ঝিকরগাছার বটখালী, লালখনি, যশোরের মালঞ্চি, বাগারপার, মাগুরা, গোয়ালন্দ, দৌলতদিয়া, মানিকগঞ্জের জোকা, নবগ্রাম, ঢাকার কামারবাড়ি ও গাবতলীর মাজার রোড। এসব পয়েন্টে গাড়ি থামানোর পর ভারতীয় পণ্য থাকার অজুহাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে আদায় করা হয় ২ থেকে ৫ হাজার টাকা।
ম্যানেজার আরো বলেন, ভারত থেকে যে কোন যাত্রী ৩০ হাজার টাকার পণ্য আনতে পারেন। তারপরও বিজিবি তল্লাশি করে। তল্লাশির সময় যাত্রী হয়রানি করার অভিযোগ আছে।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, পণ্য পরিবহনের গাড়িতে প্রতিনিয়ত চুরি ডাকাতি, ছিনতাইসহ শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটছে। দেশের মহাসড়কে চিহ্নিত কিছু চোর চক্র দেশের গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য গাড়ি ছিনতাই এবং গাড়ি থেকে কোটি কোটি টাকার পণ্য লোপাট করে দিচ্ছে। ঢাকা-নরসিংদী, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের কয়েকটি জায়গায় প্রতিনিয়ত এ ঘটনা ঘটছে। কিন্তু প্রশাসনের সঠিক সহযোগিতা না পাওয়ায় চোরদের গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দু’-একজন ধরা পড়লে তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এতে করে দেশের বাইরে আমাদের গার্মেন্টস মালিকরা তাদের বায়ার হারাচ্ছেন। অন্যদিকে একশ্রেণির স্টক লট ব্যবসায়ী তাদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিভিন্ন নামে বায়িং হাউজ খুলে চোর চক্রের সদস্যদের যোগসাজশ করে চোরাই মাল কিনছে। পরে এই চোরাই মাল দেশের বাইরে বিক্রি করছে। এ ব্যাপারে বিজিএমইএ ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে একাধিক বৈঠক করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।