যার হাতে আঁকা চার হাজার সিনেমার পোস্টার

কাপড়ের বিশাল ক্যানভাস। সামনে উজ্জ্বল সব রঙ নিয়ে দাঁড়িয়ে পাপ্পু মিয়া। পুরো নাম মোহাম্মদ হানিফ পাপ্পু। নিজ হাতে আঁকবেন সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অতিরঞ্জিত পোট্রেট! নায়িকার কষ্ট, নায়কের বীরত্ব আর পার্শ্ব-চরিত্রগুলোর নানা অভিব্যক্তিসহ আরো কত কি আল্পনা থাকবে তিনিই ভালো জানেন! একান্ত নিজের ইচ্ছেতেই ছবি আঁকবেন। কিন্তু এক সময় সকাল হলেই ঢাকাই ছবির প্রযোজক, পরিচালক থেকে শুরু করে হল মালিক সবাই এসে বসে থাকতেন তার দোকানে। নতুন চলচ্চিত্রের পোস্টার আঁকানোর জন্য। কারণ মানুষকে হলমুখী করে তোলার অন্যতম একটাই মাধ্যম ছিল, সিনেমার ব্যানার পেইন্টিং! নতুন ছবি মুক্তি পেলেই হাতে আঁকা ব্যানার-পোস্টার দেখা যেত শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে।

পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন আর হাতে আঁকা পোস্টার-ব্যানার ব্যবহার করা হয় না। যদি কখনো আঁকার জন্য হাত হিসপিস করে তাহলে নিজের ইচ্ছেতেই আঁকতে হয়। কথায় কথায় জানালেন ছবির গল্প, পোস্টার ও ব্যানার আঁকা জীবনের সেই সব সোনালি সময়ের কথা।

মামা মোহাম্মদ রফিকের কাছ থেকেই সিনেমা ব্যানার পেইন্টিংয়ের হাতেখড়ি তার। পাপ্পু বলেন, ‘আমার মামা ছবি আঁকতেন। তার ওখানেই হাতেখড়ি হয় আমার। আমার নানা কিন্তু জানতেন না যে মামা আর্ট করেন। ধার্মিক পরিবার ছিল। যদি জানতেন একেবারে ঘর থেকে বের করতেন। আমি স্কুল থেকে ফিরে মামাকে খাবার দিতে যেতাম। তখন দেখতাম যে মামা এত সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকতেন, মানে মুগ্ধতার চোখে তাকিয়ে থাকতাম। এরপর সারাদিন চোখের সামনে ভাসতো। পড়ালেখা করতাম কম, চিন্তা করতাম বেশি। ইশ! মামার মতো যদি আঁকতে পারতাম! কিন্তু মামাকে ভয়ে সেটা বলতাম না কখনো।’

একদিন সাহস করে বলেই ফেললেন সাত বছরের পাপ্পু। তার মামা কোনো কথা না বলে এগিয়ে দিলেন তুলি। শেখালেন কিভাবে রঙ করতে হয় ভালোভাবে। পাপ্পু ঝটপট করেই এঁকে দেখিয়ে দিলেন। ‘ভাগ্নে পারবে’ এমনটা ভেবে প্রতিদিন আঁকার কৌশল শেখাতেন তাকে। প্রতিদিন বিকেলে দু-তিন ঘণ্টা আঁকতে আঁকতে কখন যে এতে জড়িয়ে যান নিজেই টের পাননি। তখন থেকেই নেশা ধরে যায়, পরে তা হয়ে যায় পেশা। সেই ছোটবেলা থেকে শুরু, একে একে এঁকেছেন আনুমানিক সাড়ে চার হাজার সিনেমার পোস্টার। তিনি বলেন, ‘এক সময় দিনে ১০টার মতো পোস্টার-ব্যানার আঁকতাম আমরা। কিন্তু শৈল্পিকতায় কোনো ছাড় দিতাম না। কাহিনি, চিত্রনাট্য, গান, নাচ, অভিনয়, পোশাক সবকিছুতেই অটুট ছিল শিল্পের প্রকাশ। আর এখন সবকিছুতেই কপি।’

মামার কাছ থেকে হাতেখড়ি হলেও তার শৈল্পিক ওস্তাদ ছিল ‘গ্রিন বাবু’। ১৯৭০ সালে তিনি আঁটঘাট বেঁধে চলে যান ভারতে। তারপর অ্যাসিসট্যান্ট থেকে পুরোদমে শিল্প হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর আঁকেন ‘অবুঝ মন’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, লাইলী মজনু, জাগো হুয়া সাভেরা, সংগমসহ অনেক বিখ্যাত ও ব্যবসাসফল ছবির পোস্টারের ব্যানার। শুধু তাই নয়, হলিউড ছবি ‘চেঙ্গিস খান’-এর পোস্টারও তার হাতে আঁকা।

সিনেমার পোস্টার আঁকার রমরমা অবস্থা শুরু হয় আশির দশকে। পাপ্পু বলেন, ‘সেসময়ে প্রতি সপ্তাহে দু-তিনটা করে সিনেমা রিলিজ হতো। এরপর নব্বইয়ের দশকে সপ্তাহে চার-পাঁচটা করে ছবি রিলিজ পেতো। একটা সিনেমার কমপক্ষে ত্রিশ-চল্লিশটা বড় ব্যানার হতো। এতগুলো ব্যানার কিন্তু এক সপ্তাহেই আঁকা লাগতো। এভাবে চলতে থাকে বেশ কয়েকবছর। কাজের চাপে তো দিন-রাত ভুলে যেতাম। অসুস্থ থাকলেও আঁকতে হতো। কারণ একটা হল যদি মিস হয় তাহলে পুরো ঝামেলা আমাদের ওপর পড়তো।’

পাপ্পু জানান, আশির দশকের সিনেমার পোস্টারে ফুটে তুলতে হতো সামাজিক সমস্যার গল্প, লোককাহিনি নির্ভর, রোমান্টিক প্রেম, ফ্যান্টাসি, রম্য বিনোদন বা কমেডি, বিদ্রোহ সংগ্রাম আন্দোলন যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতি। ছবির পোস্টারের সবই শিল্পীরা নিজ হাতে জীবন্ত করে তুলেছেন রঙ-তুলি ব্যবহার করে। পোস্টারগুলোয় প্রধান চরিত্র, বিশেষ করে নায়ক-নায়িকার অবয়বকে বেশি ফোকাসে রাখা হতো। চেষ্টা করা হতো প্রযোজক-পরিচালক ছাড়াও ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রী, সিনেমাটোগ্রাফার, সঙ্গীতশিল্পী ও পরিবেশন প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করার।

সেসময়ে যাদের পোস্টার তৈরির প্রয়োজন তাদের বড় সুবিধা হলো এখানে সংশ্লিষ্ট ছবির কলাকুশলীর শুধু মুখের ছবিই যথেষ্ট, বাকিটা করে দেবেন ‘পোস্টারশিল্পী’ স্বয়ং। কেননা, মুখের সঙ্গে মানানসই হাজারো নায়ক-নায়িকার পুরো শরীরের ছবি এ পোস্টারশিল্পীদের কম্পিউটারে যে বোঝাই। এছাড়া পোস্টারে কোন ধরনের বিষয় ও রঙকে প্রাধান্য দিতে হবে সেটাও বলে দিতেন প্রযোজকরা, বাকি কাজ ছিল শিল্পীর!

পাপ্পু রঙ করার কাজে প্রচলিত তেল বা জলরঙয়ের কোনোটাই ব্যবহার করতেন না খুব একটা। বাজারের সহজলভ্য সাধারণ গুড়ো রঙয়ের সাথে তিসির তেল মিশিয়ে বিশেষ এক রকমের পেস্ট তৈরি করে সেটা দিয়ে রঙ করতেন! তবে ষাটের দশক থেকেই খরচ কমানোর জন্য রঙয়ের কাজে প্রেস ইঙ্ক বা প্রেসের কালি ব্যবহার করেছেন। আর ছবির উজ্জ্বলতা বাড়াতে ফ্লোরোসেন্ট রঙ ব্যাবহার করা হতো। ষাটের দশকে কিছু ব্যানারে স্প্রে এবং কোলাজের কাজের ব্যাবহারের কথাও জানান তিনি! খানা আতা পরিচালিত ‘ঝড়ের পাখি’ সিনেমার বিশাল একটা ব্যানার করা হয়েছিল কোলাজের মাধ্যেম!

বিশ শতকে কমতে থাকে হাতে আঁকা পোস্টারের কাজ। তখন যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেত তার অর্ধেক পোস্টার ডিজিটাল ব্যানার হতো। পাপ্পু বলেন, ‘২০০১ সালের ফিল্মের কাজ কমতে থাকে। আমাগো দিয়া একটা ফিল্মের ব্যানার করাইতে যে টাকা খরচ হতো একই সাইজের পলি ব্যানার করে এরা ছয় পোস্টার করাতে পারতো। কে এত টাকা টাকা লস দেবে? আছে কেউ? তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ব্যানার-পোস্টার করা বন্ধ হয়ে গেছে। কমে গেল আমাদের ইনকামও। কিন্তু আগের যে সিনেমার পোস্টারের রঙ, এখন আর সেটা নেই।’

অর্ধশতাব্দি ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত থাকা পাপ্পুর এখনো একটি স্থায়ী ঠিকানা আছে। বকশি বাজার লেনের? ‘রিকশা আর্ট গ্যালারি’ তারই প্রতিষ্ঠান। এই দোকানে এখন আর চলচ্চিত্রের পোস্টার-ব্যানার করা হয় না। কারণ পরিচালক, পরিবেশক বা প্রেক্ষাগৃহের কেউই আসেন না হাতে আঁকা ব্যানার ও পোস্টার করাতে। সবাই এখন ডিজিটাল পোস্টার ও প্রিন্টিং পোস্টারের দিকে ঝুঁকেছে। তাই এখন দেয়াল লিখন, সাধারণ ব্যানার, বিভিন্ন পেইন্টিংয়ের কাজ করে থাকেন তিনি। এক সময় পোস্টারের পাশাপাশি রিকশা পেইন্টিংও করেছেন। এখন সেই রিকশা পেইন্টিংয়ের প্রচলনও খুব একটা নেই। পাপ্পু বলেন, ‘এখন আর ওই সম্মানটা পাই না। এক সময় সবাই সম্মান করতো। সিনেমার পোস্টার আর্টিস্ট না ডেকে এখন রিকশা আর্টিস্ট বলে ডাকে সবাই। অথচ সিনেমার পোস্টারের কাজ না পেয়েই রিকশায় আঁকতে হলো।’

আলাপের এক পর্যায়ে জানালেন পরিবারে তিনি এক মেয়ে সন্তানের বাবা। মেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়ে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। বাকি জীবন কিভাবে কাটাবেন, জানেন না নিজেই। তবে তার ইচ্ছে রঙের সাথেই বাকি জীবন কাটাতে।

পাপ্পুর মতো শিল্পীদের প্রতিষ্ঠানিক ছোঁয়া থাক কিংবা না থাক, সিনেমার এই সকল ব্যানার পেইন্টিং নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র, বিশাল বিশাল ক্যানভাস, খুব উজ্জ্বল গোলাপী, হলুদ, নীল, লাল রঙের ব্যবহার, মানব দেহের অতিমাত্রিক উপস্থাপন ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে নতুনমাত্রা যোগ করেছে!

 

ছবি: তন্ময় মির্জা