প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার সংগ্রহশালা ময়নামতি জাদুঘর

এক সময় ভারতবর্ষের সমতট রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত স্থান বর্তমান কুমিল্লা। যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ভাগিরথীর পূর্ব তীর থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে সমতট রাজ্য বিস্তৃত ছিল। এটি বাংলাদেশের অন্যতম এক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্বলিত স্থান। যেখানে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শনসহ বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। বহু বছর পূর্বে খ্রিস্টীয় আনুমানিক ৩৩৫-৭৫ রাজত্বকারী সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ স্তম্ভলিপিতে সমতটের উল্লেখ্য পাওয়া যায়। কুমিল্লার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে ময়নামতি জাদুঘর অন্যতম। এ জাদুঘরটি এখন শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো সংগ্রহশালাই নয়, যা এখন শিক্ষার্থী, পর্যটক, তথা দেশি-বিদেশি গবেষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ জাদুঘরটি শিক্ষার পাশাপাশি একইসাথে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

আজ থেকে ৫২ বছর পূর্বে ময়নামতি জাদুঘরটি ১৯৬৬ সালের ১২ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। যা সময়ের ও যুগের পরিবর্তনে পেয়েছে নানা রূপ। কুমিল্লার শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, শ্রীভবদের মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, রূপবানমুড়া, ইটাখোলা মুড়া, রানির বাংলা, ভোজ বিহারসহ বিভিন্ন বিহার খননকালে পুরোনো দিনের অনেক মূল্যবান পুরাসামগ্রী খুঁজে পাওয়া যায়। এসব পুরাবস্তু সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্যই শালবন বিহারের দক্ষিণ পাশে শালবনকে সামনে রেখে পশ্চিমমুখী একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়। জাদুঘরের প্রবেশপথের বাঁ পাশেই রয়েছে গৌতম বুদ্ধের বিশালাকার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি। তারপরেই রয়েছে বেলে পাথরে দণ্ডায়মান বৌদ্ধের মূর্তি, যা আনুমানিক ৭ম শতকের দিকে তৈরি। ১২-১৩ শতকের দুটো তাম্র শাসনের পাণ্ডুলিপি রয়েছে। এসব বিষয় বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর প্রকাশিত প্রত্মতাত্ত্বিক প্রকাশনা ময়নামতি-লালমাই পুস্তিকায়ও বর্ণনা রয়েছে।

ময়নামতি জাদুঘরকে কেন্দ্র করে এর পাশে একটি প্রত্মতত্ত্ব বিভাগীয় বিশ্রামাগার ও বেশ মনোরম ফুলের বাগানও গড়ে তুলেছে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর। জাদুঘরের মূল ভবনে গুরুত্বপূর্ণ পুরাবস্তু প্রদর্শনের জন্য স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ১৯৭০-৭১ সালে এর দক্ষিণ পাশ বর্ধিত করায় ভবনটি ইংরেজি ‘টি’ অক্ষরের আকার ধারণ করে। জাদুঘরের ভবনে মোট ৪২টি খোপ রয়েছে। যাতে পুরাবস্তুসমূহ প্রদর্শনের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। জাদুঘরের প্রবেশ পথের বামদিকে থেকে ১নং খোপে রাখা নিদর্শন দিয়ে প্রদর্শনী আরম্ভ করে ক্রমান্বয়ে চারদিক ঘুরে ঘুরে প্রবেশদ্বারের ডানদিকে ৪২নং প্রদর্শনীতে এসে শেষ হয়েছে। ভবনের উত্তর দিকে পরিসর বাড়িয়ে আরো ২১টি আধার সংযুক্ত করা হয়েছে। যেগুলোতে এখনো কোনো প্রদর্শনী বস্তু রাখা হয়নি। প্রদর্শনী আধারগুলোতে প্রত্মতাত্ত্বিক স্থান খননের উম্মোচিত স্থাপত্যসমৃদ্ধ ধ্বংসাবশেষের ভূমি-নকশা, প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, ধাতুলিপি ফলক, মৃন্ময় মুদ্রক-মুদ্রিকা, ব্রোঞ্জের মূর্তি, পাথরের মূর্তি, কাঠের মূর্তি, লোহার পেরেক, পাথরের গুটিকা, অলঙ্কারের অংশ, ঘরে ব্যবহূত মাটির হাঁড়ি পাতিলসহ প্রাচীনকালে ব্যবহূত তৈজসপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া আধারের ফাঁকে ফাঁকে মেঝের ওপর জাদুঘর ভবনের বিভিন্ন স্থানে কিছু পাথর এবং ব্রোঞ্জ মূর্তিও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। এসব মূর্তির কয়েকটি প্রাচীন সমতটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগৃহীত। জাদুঘরে প্রদর্শনের উল্লেখযোগ্য পাথর ও ব্রোঞ্জ মূর্তিগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের পাথরের দণ্ডায়মান লোকোত্তর বুদ্ধমূর্তি, ত্রি বিক্রম বিষ্ণুমূর্তি, তারা মূর্তি, মারীছী মূর্তি, মঞ্জুরের মূর্তি, পার্বতী মূর্তি, হরগৌরী মূর্তি, নন্দী মূর্তি, মহিষমর্দিনী মূর্তি, মনসা মূর্তি, গনেশ মূর্তি, সূর্য মূর্তি, হেরচক মূর্তি এবং ব্রোঞ্জের বজ্রসত্ব মূর্তি অন্যতম। এছাড়াও ছোট-বড় আকারের ব্রোঞ্জের ও মাটির তৈরি মূর্তি রয়েছে। এ জাদুঘরে রয়েছে ব্রোঞ্জের তৈরি বিশালাকায় একটি ঘণ্টা। যার ওজন আনুমানিক ৩৭০ কেজি। এ জাদুঘরের আধারে সুরক্ষিত রয়েছে ময়নামতিতে পাওয়া প্রাচীনকালের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, ব্রোঞ্জ, তামার ও লোহার তৈরি সামগ্রী, মাটির তৈরি বিভিন্ন প্রকারের খেলনা, কাঠের কাজের নিদর্শন, তুলট কাগজে লেখা প্রাচীন হস্তলিপির পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন নমুনার মৃত্পাত্র প্রভৃতি।

জাদুঘর পরিদর্শনের সময়সূচি

ময়নামতি জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য প্রতি সপ্তাহে শনিবার ব্যতীত ৬ দিন খোলা থাকে। এছাড়া সপ্তাহের প্রতি রবি ও সোমবার অর্ধ দিবস সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকে। মধ্যাহ্ন বিরতি হলো দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। শীতকালে সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। দুপুর ১টা থেকে ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে দুপুরর ১২টা এবং বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে। রমজানে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রদর্শনের সময়। মধ্যাহ্ন বিরতি ১টা থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। এছাড়া জাদুঘরটি সরকারের অন্যান্য নির্বাহী আদেশে ঘোষিত সকল ছুটির দিনেও বন্ধ থাকে।

 

যেভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ ও কমলাপুর থেকে বেশ কয়েকটি ভালোমানের বাস পাওয়া যায়। কুমিল্লা পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র ২ থেকে ২টা ৩০ মিনিট। এছাড়া কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে ট্রেনেও যাওয়া সহজ। ঢাকা থেকে কুমিল্লার দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার। বাসে গেলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট অথবা কোটবাড়ি বিশ্বরোড নেমে যাবেন। ভাড়া নেবে ১৫০-৩০০ টাকা পর্যন্ত। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে কোটবাড়ি যাওয়ার বাস (ভাড়া ১৬ টাকা) অথবা কোটবাড়ি বিশ্বরোডে থেকে কোটবাড়ি যেতে সিএনজিতে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ১০ টাকা।

 

শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়