আমাদের এই অগ্রযাত্রা থাকবে নিয়ত সঞ্চারণশীল: অর্থমন্ত্রী

 
ছয় শতাংশের বৃত্ত ভেঙে প্রবৃদ্ধির উচ্চতর সোপানে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে নবম বারের মতো জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে পরপর দুই মেয়াদে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। আমরাও জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, সবার সহযোগিতা পেলে বিশেষ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এ মেয়াদেও আমরা অনেক দূর এগোতে পারব।’
 
বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টায় অর্থমন্ত্রী বাজেট উপস্থাপন শুরু করেনে। এর আগে ৮ বার বাজেট উপস্থাপন করেছেন তিনি। এবারো ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থাত্ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করা হয়।
বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের স্বরণ করেন। সেই সাথে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অপরাজনীতির শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারানো এবং বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ যন্ত্রণাকাতর মানুষদের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান।
 
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এগিয়ে যাওয়ার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে আমরা এতটুকু বিচ্যুত্ হব না। রূপকল্প ২০২১-এর ধারাবাহিকতায় এই মেয়াদের মধ্যেই জাতিকে নতুন প্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপকল্প ২০৪১ জাতিকে উপহার দেয়া হবে। এই নতুন রূপকল্পের হাত ধরে ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ, সুখি ও উন্নত জনপথ। সুশাসন, জনগণের সক্ষমতা ও ক্ষমতায়নই হবে এই রূপকল্প বাস্তবায়নের মূলমন্ত্র।’
 
আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আমার বিশ্বাস চলতি মেয়াদ শেষেই বাংলাদেশ কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পের ব্যাপক হারে প্রসার ঘটবে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে, রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলো যানজটমুক্ত হবে, কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে এবং তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে।’
 
তিনি বলেন, ‘জ্বালানি ও বিদ্যুত্ ছাড়া কোথাও কর্মচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় না। তাই ঘরে ঘরে বিদ্যুত্ পৌঁছে না দিলে জাতি এগুতে পারে না। সুতরাং, এ ক্ষেত্রে আমদের অগ্রযাত্রা দ্রুতায়িত করতে হবে। সব প্রতিবন্ধকতা তুচ্ছ করে আমাদের কর্মঠ, কষ্টসহিষ্ণু, সাহসী ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা সাধারণ জনগণ তাদের শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতা দিয়ে এই অগ্রগতির চাকা সচল রেখেছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস—আমাদের এই অগ্রযাত্রা থাকবে নিয়ত সঞ্চারণশীল। আমি বারাবরই এ দেশের অপরিমেয় সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী। আবার পুনরাবৃত্তি করব যে আমি আশাবাদী। আলোকোজ্জ্বল, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই অভিযাত্রায় আসুন দেশের উন্নয়ন ও দেশের মঙ্গলের স্বার্থে আমরা সব বিভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাই। সব ধরনের অকল্যাণকর ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকি। গড়ে তুলি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, উন্নয়নকামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।’
 
বাজেট বক্তৃতার শুরুতে অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির বিভিন্ন অর্জন বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
 
তিনি বলেন, ‘আমার স্বীকার করেতে দ্বিধা নেই—বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্লথগতি, প্রতিকূল রানৈতিক পরিবেশ এবং ব্যাক্তিখাতে বিনিয়োগের অপর্যাপ্ততার কারণে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মেয়াদে লক্ষ্য অনুযায়ী—জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি। রাজস্ব খাতে কর আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব শুরু হলেও আশানুরূপ গতি পায়নি। অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় বাড়লেও তা ছিল লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। অনেকগুলো প্রকল্প যথাসময়ে বাস্তবায়িত হলেও ভূমি অধিগ্রহণজনিত সমস্যার কারণে কোনো কোনো অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে। রপ্তানি দ্রব্য ও বাজার বৈচিত্র্যায়নে উন্নতি হয়েছে সীমিত। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য অনুযায়ী অগ্রগতি না হরেও সার্বিক অর্জন জনমনে স্বস্তি দিয়েছে।’
আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে নিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্ধিত সরকারি বিনিয়োগ সত্ত্ব্বেও মূলত বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাধা হিসেবে কাজ করছে। এ বাধা উত্তরণে বিদ্যুত্, জ্বালানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে সকল কার্যক্রম আমরা বাস্তবায়ন করতে শুরু করেছি, তাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তথা অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল থাকবে।’
 
অর্থমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন, ‘সরকারি খাতে বর্ধিত বেতন-ভাতা ও উচ্চ রেমিটেন্স প্রবাহ ভোগ ব্যয় বৃদ্ধি করবে। জিডিপি অনুপাতে সরকারি ব্যয়, বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে। তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় ভর্তুকি ব্যয় কমছে। এই সাশ্রয়কৃত অর্থ অগ্রাধিকার খাতে সঞ্চালন করা হবে।’
 
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতক দলগুলোর মধ্যে শুভ বুদ্ধির উন্মেশ ঘটবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে উত্সাহিত হবেন। অবশ্যি, এখানেও কালো মেঘ হিসেবে দেখ দিয়েছে ইউরোপের অস্থিরতা। এ সব অনুমানের ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।