হাসিনা সরকারের ১২তম বাজেট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ১২তম বাজেট গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। আগের মেয়াদসহ টানা সপ্তম বাজেট এটি। এর আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে পাঁচবার তার সরকারের বাজেট দেয়া হয়। গতকাল ঘোষিত বাজেটে বিভিন্ন খাতে কর হারের পুনর্বিন্যাস, দেশীয় শিল্প রক্ষা ও উন্নয়নের অগ্রাধিকার অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মধ্য আয়ের দেশে যেতে তার আগেকার বাজেটের আলোকেই আগামী বছরের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেয়া হয়।

 

আশা করা হচ্ছে ২০১৮ সালের মধ্যেই দেশ মধ্য আয়ের দেশে পা রাখবে। ইতোমধ্যে মধ্য আয়ের সিঁড়িতে পৌঁছে গেছে দেশ। এই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে জাতিকে। সেজন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই বিনিয়োগ করতে গিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর চ্যালেঞ্জও নিয়েছে সরকার।

 
২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য পেশকৃত এই বাজেটে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তদুপরি, জুলাই ২০১৫ থেকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হচ্ছে। সেই আলোকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন বাজেটে।
 
বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে সরকার অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ব্যাপক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও নিয়েছে। ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়েছে উেস কর কর্তনের পরিধি। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের আওতাও বাড়ানো হয়েছে। শুল্ক হারের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে রাজস্ব খাতের সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে রেয়াতি সুবিধা দেয়া হয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্য, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতের বিদ্যমান শুল্ক মওকুফ সুবিধা আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত রাখা হয়েছে। কোনো কোনো পণ্যে সম্পূরক শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কহারও হ্রাসবৃদ্ধি করা হয়েছে। আমদানি শুল্কস্তর পুনর্বিন্যাস করে একস্তর বাড়ানো হয়েছে। এখন শূন্য হার ছাড়াও এক, দুই, পাঁচ, দশ ও পঁচিশ শতাংশ বিশিষ্ট শুল্কস্তর করা হয়েছে। কমানো হয়েছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি শুল্ক। আগের ২ শতাংশের বদলে এই হার এখন ১ শতাংশ হবে যা শিল্পে বিনিয়োগ উত্সাহিত করবে।
 
বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে প্রদত্ত আমদানি শুল্ক ও কর রেয়াতি সুবিধা আগামী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকছে। তবে তৈরি পোশাক খাতে উেস কর দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। পোশাক খাতের কিছু পণ্যে সম্পূরক শুল্কহার হ্রাস করার ফলে আমদানিতে খরচ কমবে। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতাও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ছিটমহলের উন্নয়নে ২শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়েছে গাড়ি তৈরি শিল্পে। এই শিল্পকে ভারী শিল্পের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।
 
শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের কথা মাথায় রেখে কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে। জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে প্রতিটি জেলার জন্য থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর মুক্ত সীমা বাড়িয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
 
বাজেট পরিসংখ্যান
 
আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ২ লাখ ৯৫ হাজার ১শ’ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ঋণ নেয়া হবে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। বৈদেশিক উত্স থেকে নেয়া হবে ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদান প্রাপ্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা।
 
মোট অনুন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্য ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। অপরদিকে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা।
 
বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা
 
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা দূর করে মধ্যমেয়াদে তা জিডিপির ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য সরকারের। এ জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরের মতো প্রবৃদ্ধি সহায়ক খাতসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোগত যেমন বিদ্যুত্, জ্বালানি, পরিবহন, যোগাযোগ, বন্দর উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইসিটি খাতে অধিকতর বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।
 
বাজেটে আয়ের প্রাক্কলন
 
আগামী বছরে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর বাবদ আদায়ের লক্ষ্য ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় বাড়াতে উেস কর কর্তন ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে। উেস কর কর্তনের পরিধি বাড়িয়ে স্বতন্ত্র কর অঞ্চল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
 
উন্নয়ন বরাদ্দ
 
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাবরের মতোই অবকাঠামো, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আঞ্চলিক সমতার বিষয়টিও এবারে গুরুত্ব পেয়েছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। মোট ৯৭ হাজার কোটি টাকার এডিপির মধ্যে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে ১০.৮৫ শতাংশ, সার্বিক কৃষি খাতে ৫.০৭ শতাংশ, বিদ্যুত্ খাতে ১৬.৭৪ শতাংশ, ভৌত অবকাঠামো খাতে ১১.৩১ শতাংশ, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ২২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
 
সবুজ বই
 

এবারে বাজেট বক্তৃতার বইয়ের মলাট সবুজ করা হয়েছে। বাজেট প্রস্তাব পেশকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, এখন থেকে এই বইটির মলাট সবুজ রঙের হবে।