গোল্ডেন রাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ড বা সংক্ষেপে রেজি অ্যাওয়ার্ড চলচ্চিত্র জগতের পুরষ্কারসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ভিন্নধর্মী। অস্কারে যেমন চলচ্চিত্র অঙ্গনের সেরাদের পুরস্কৃত করা হয় গোল্ডেন রাস্পবেরি বা ‘রেজি’ পুরস্কারের ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টো কাজটি করা হয়। চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে সবচেয়ে বাজে পরিবেশনা ও উপস্থাপনার জন্য ১৯৮১ সাল থেকে এই পুরস্কার দিয়ে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ডেন রাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন। প্রতিবছর অস্কার অনুষ্ঠানের আগের রাতে এ অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। অস্কার পুরস্কারের পাশাপাশি বাজে কাজকে নিরুত্সাহিত করতে ৩৯ বছর ধরে দেওয়া হচ্ছে এই অ্যাওয়ার্ড। বাজে পারফর্ম্যান্সের জন্য রেজি বিজয়ীরা পেয়ে থাকেন সোনার স্প্রে করা ট্রফি।
১৯৮১ সালের ৩১ মার্চ রেজির প্রতিষ্ঠাতা জন জেবি উইলসনের বাসভবনে এই পুরস্কারটির যাত্রা শুরু হয়। যাত্রার শুরুর গল্পটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। আমেরিকান প্রকাশক জেবি উইলসন ৫৩তম একাডেমিক পুরস্কারের রাতে তার বাসায় একটি পার্টি আয়োজন করেন এবং সেখানে তার বন্ধুদের একটি লক্ষ্যহীন পুরস্কার উপস্থাপনার আমন্ত্রণ জানান। তখন উইলসন উপস্থিত সবাইকে ‘ক্যান্ট স্টপ দ্য মিউজিক’ ও ‘জ্যানাডো’ এই দুটি চলচ্চিত্র দেখান। তিনি সবাইকে বলেন এই দুই চলচ্চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ চলচ্চিত্র নির্বাচন করতে। সবাই ক্যান্ট স্টপ দ্য মিউজিককে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে এবং সাথে সাথে উইলসন এই চলচ্চিত্রকে প্রথম গোল্ডেন রাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ড জয়ী হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে রেজির প্রথম অনুষ্ঠান পূর্বপ্রস্তুতি ব্যতীত ৩৬ জনের উপস্থিতিতে সফলভাবে সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোল্ডেন রাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ডে পূর্ববর্তী আয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ লোকের উপস্থিতি ছিল। চতুর্থ রেজি সিএনএনসহ আরো কয়েকটি প্রধান গণমাধ্যম সম্প্রচার করেছিল। উইলসন তখন বুঝতে পারলেন অস্কারের আগের রাতে যদি তার এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা যায় তাহলে সেটি মিডিয়ার কাছে আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। কারণ অস্কারের রাতে অস্কারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা বোকামি বৈকি আর কিছুই নয়। ২০০৯ সালের পর থেকে ৬৫০জন সাংবাদিক, আমেরিকার ৪৫টি রাজ্য ও বিশ্বের ১৯টি দেশের চলচ্চিত্র ভক্তদের ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় কে বা কারা পাবে এই অ্যাওয়ার্ড।
বলাই বাহুল্য অস্কারে যেমন তারার মেলা বসে এখানে ঠিক তার বিপরীত। সাধারণত কোনো তারকা নিজে থেকে এই অপমানকর পুরস্কার নিতে এখানে আসে না। তবে একেবারে যে আসে না তা নয়। বেশ কয়েকজন তারকা এর প্রহসন মূল্য বুঝতে পেরে হাজিরা দিয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন টম গ্রিন (নিকৃষ্টতম অভিনেতা ও পরিচালক), হ্যালি বেরি (নিকৃষ্টতম অভিনেত্রী), স্যান্ড্রা বুলক (নিকৃষ্টতম অভিনেত্রী), মাইকেল ফেরিস (নিকৃষ্টতম চিত্রনাট্য), জো এস্টারহাস (নিকৃষ্টতম চিত্রনাট্য) এবং পল ভারহোভেন (নিকৃষ্টতম পরিচালক)।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনজন ব্যক্তি একই বছর রেজি ও অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। তারা হলেন ১৯৯৩ সালে এলান মেনকেন, ১৯৯৮ সালে ব্রায়ান হেলগেলান্ড ও সর্বশেষ ২০১০ সালে সাল্ড্রা বুলক। ১৯৮৭ সালে ওয়াল স্ট্রিট মুভিও একই বছর এই দুই বিপরীতধর্মী পুরস্কার জিতে নেয়। রেজিতে মোট ১০টি ক্যাটাগরিতে বাজে চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে উপস্থাপনের জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়। তা হলো চলচ্চিত্র, পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, সহযোগী অভিনেতা, সহযোগী অভিনেত্রী, চিত্রনাট্য ও পূর্বকাহিনিতে নির্মিত চলচ্চিত্র। পূর্বে গান, উদীয়মান তারকা, আলোকচিত্র এসব ক্ষেত্রে খারাপ উপস্থাপনের জন্যও রেজি অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হতো।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারো যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসের প্যালেস থিয়েটারে ঘোষণা করা হয় ৩৯তম গোল্ডেন রাস্পবেরি অ্যাওয়ার্ড তথা রেজি বিজয়ীদের নাম। এবারের আসরে ২০১৮ সালের সবচেয়ে বাজে ছবির পুরস্কার পেয়েছে শার্লক হোমস কমেডি ‘হোমস অ্যান্ড ওয়াটসন’। গোটি, দ্য হ্যাপিটাইম মার্ডারস, রবিন হুড ও উইনচেস্টারকে হারিয়ে এ অসম্মানজনক কৃতিত্ব অর্জন করে ছবিটি। ‘হোমস অ্যান্ড ওয়াটসন’ বাজে ছবি ছাড়াও সেরা বাজে রিমেক, সেরা বাজে পার্শ্ব-অভিনেতা ও সেরা বাজে নির্মাতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারগুলো লাভ করেছে। বাজে নির্মাতার পুরস্কার পেয়েছেন ইটান কোহেন। রেজির প্রতিষ্ঠাতা উইলসন তার হোমস অ্যান্ড ওয়াটসন ছবিটিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা উপাখ্যানের অদ্ভুত প্যারোডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবারের রেজি আসরে মেলিসা ম্যাককার্থি সেরা বাজে অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন। আর-রেটেড পাপেট কমেডি ছবি ‘হ্যাপিটাইম মার্ডারস’ ও ‘লাইফ অব দ্য পার্টি’ ছবিতে বাজে অভিনয়ের কৃতিত্বস্বরূপ তিনি এ পুরস্কার লাভ করেছেন। এছাড়া ম্যাককার্থি ‘ক্যান ইউ এভার ফরগিভ মি?’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন ‘রেজি রিডিমার’ পুরস্কারটি। এবারের রেজির সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও সেরা বাজে অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘ডেথ অব আ নেশন’ ও ‘ফারেনহাইট ১১/৯’ প্রামাণ্যচিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করে এ পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এছাড়া সেরা বাজে জুটির পুরস্কারও পেয়েছে ট্রাম্প ও তার ছায়া চরিত্র। এদিকে সেরা বাজে চিত্রনাট্যের পুরস্কারটি পেয়েছে রোমান্টিক সিক্যুয়াল ‘ফিফটি শেডস ফ্রিড’।