দু’দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা

* গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তে গড়ে ওঠা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আস্তানা
 
* উলফাদের ফেলে যাওয়া ১৭ হাজারের বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে পুলিশ ও র্যাব।
 
* দশ ট্রাক অস্ত্র ও ট্রাক ভর্তি গুলি উদ্ধারের মত কোন ঘটনা ঘটেনি
 
* অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। ভারতও ফেরত দিয়েছে কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে
 
প্রতিবেশী দু’দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে কী না হতে পারে। কী নিরাপত্তা, কী অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। তারই বাস্তব উদাহরণ গত আট বছরের বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। দু’দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে তিন দশক ধরে চলা ভারতের সেভেন সিস্টার নামে খ্যাত সাত রাজ্যে (আসাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম ও অরুনাচল) রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জনপদে বিরাজ করছে প্রশান্তির পরশ। যেখানে ভারতের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফাসহ ১৩টি সংগঠনের সশস্ত্র সংঘাত ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। এক সময় এ উলফাসহ বিচ্ছিন্নতবাদী সংগঠনগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। তাদের সহযোগিতায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ৫টি জেলা-জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের বিশাল দুর্গম এলাকা থেকেই তারা ভারতবিরোধী সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে শুরু করেছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণের পরই মূলত উলফার মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে। অবসান হয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তত্পরতা। ভারতের সেভেন সিস্টার রাজ্যগুলোতে ফিরে এসেছে স্বস্তি।
 
অপরদিকে গত আট বছরে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের মতোও কোন ঘটনা ঘটেনি। গোয়েন্দা সংস্থা ও র্যাবের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, গত আট বছরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সীমান্তবর্তী আস্তানা থেকে ১৭ হাজারের বেশি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে পুলিশ ও র্যাব। অপরদিকে আটক করার পর উলফার বহু সদস্যকে পুশ ব্যাক করা হয়েছে ভারতে। যারা সংঘাতের পথ ছেড়ে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে।
 
অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময় ভারতে পালিয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের ব্যাপারেও ভারত সরকারের মনোভাবে পরিবর্তন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতে অবস্থানকারী বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত সরকার। ভারত সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে ভারতে আশ্রয় নেয়া বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের তত্পরতা কমে গেছে। তাদেরকে অনেকেই ভারত ছেড়েছে। গ্রেফতার হয়ে ভারতে কারাগারে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুন মামলার আসামি নুর হোসেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন। অপরদিকে বাংলাদেশে পালিয়ে থাকা ভারতের মুম্বাইয়ের অপরাধ জগতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ভাতিজা এবং সঙ্গীত পরিচালক গুলশান কুমার হত্যা মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি আব্দুর রউফ দাউদ মার্চেন্টকে ঢাকায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
 
অন্যদিকে ভারত প্রবিবেশী দেশ হলেও এ যাবত্কাল ছিল না বন্দী বিনিময় চুক্তি। বছরখানেক আগে এ চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় অনুপ চেটিয়াকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। একইভাবে চলছে নুর হোসেনকে আনার ব্যাপারটিও। দুই দেশের পুলিশ টিম উভয় দেশে জঙ্গি তত্পরতা বন্ধে সফর করেছে ঢাকা ও কোলকাতায়।
 
সেভেন সিস্টারঃ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার নামে খ্যাত (সাত বোন) রাজ্য আসাম, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম ও অরুনাচলে বিরাজ করছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সশস্ত্র সংঘাত। এখানে সশস্ত্র সংগঠনগুলো নিজ নিজ ভূমির স্বাধীনতার দাবিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। সংগঠনগুলোর মধ্যে বেশি প্রভাবশালী ছিল আসামের উলফা (ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম)। অনুপ চেটিয়ার নেতৃত্বে এটি গঠিত হয় ১৯৭৯ সালে ৭ এপ্রিল। দিল্লি কখনোই উলফার দাবিকে গ্রাহ্য করেনি। ফলে ভারতের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে উলফার সশস্ত্র সংঘাত আসামের জনপদকে দফায় দফায় রক্তাক্ত করেছে। কিন্তু ক্রমশ এ যুদ্ধ চলে যায় আসামের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে। দিন যতই যেতে থাকে সংগঠনটি ধীরে ধীরে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়। প্রথম থেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় উলফার সকল নেতা।
 
তবে সংগঠনটি গঠিত হবার এক দশক পর ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ও ভুটানে উলফার তত্পরতা শুরু হয়। ১৯৯১-১৯৯২ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর উলফারা আস্তানা গাড়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী ৫টি জেলা- জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের বিশাল দুর্গম এলাকায়। এখান থেকেই তারা ভারতবিরোধী সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে শুরু করে ? তখন থেকে তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিভিন্ন অস্ত্রের চালান বহন করে ঘাঁটিতে নিয়ে যেত। নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে চলছিল উলফার কার্যক্রম।
 
কিন্তু আওয়ামী লীগ (১৯৯১-৯৬) শাসনামলে উলফার সব ধরনের তত্পরতা বন্ধ করে দেয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে উলফা নেতারা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১৯৯৭ সালের ২১ ডিসেম্বর উলফার শীর্ষ নেতা অনুপ চেটিয়া, বাবুল শর্মা ও লক্ষীপ্রসামকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতার হবার পর থেকেই অনুপ চেটিয়া কারাগারে আটক রয়েছেন।
 
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলে উলফা সদস্যরা আবারও প্রকাশ্যে আসে। বেড়ে যায় তাদের কার্যক্রম। ২০০৩ সালে উলফার সামরিক কমান্ডার মেজর রঞ্জু চৌধুরী শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার গজারীকুড়া গ্রামের আদিবাসী পরিবার মনিন্দ্র মারাকের কন্যা সাবিস্ত্রী ম্রং কে বিয়ে করে গাজনীতে নির্মিত বিলাস বহুল দ্বিতল ভবনের বাড়িতে বসবাস করেন।
 
২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার ও আমিন বাজারে গ্রেনেড হামলার সময় গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে উঠে আসে গারো পাহাড়ের উলফা আস্তানা ও রঞ্জু চৌধুরীর নাম। পুলিশ রঞ্জু চৌধুরীসহ কয়েকজনকে আটক করলেও তাদের পরে ছেড়ে দেয়া হয়। ২০০৩ সালের ২৭ জুন রাতে বগুড়ার কাহালুতে ট্রাকভর্তি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল উলফাদের জন্য আনা প্রায় এক লাখ চাইনিজ রাইফেলের গুলি ও ১৭৬ কেজি বিস্ফোরক। তবে মহাজোট সরকারের সময় ২০১০ সালের ১৭ জুলাই র্যাব সদস্যরা রঞ্জু চৌধুরীকে কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করে।