সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ—ভারত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণে আন্তঃবাণিজ্য প্রসার লাভ করতে পারেনি। পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের কারণে এখন বাণিজ্য বেড়েছে। প্রসারিত হয়েছে সহযোগিতার নানা ক্ষেত্র। বাংলাদেশের দুর্বল অবকাঠামোর উন্নয়নেও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে ভারত। স্বল্পোন্নত প্রতিবেশী এই দেশটির প্রতি ভারত সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর্থ-সামাজিক খাতেও প্রভাব ফেলেছে।
একথা সত্য যে, দু’দেশের সম্পর্কের জায়গায় কিছু জটিলতা ছিল। ছিল সীমাবদ্ধতাও। তারপরও নষ্ট হয়ে যায়নি সম্ভাবনা। বরং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে দু’দেশের সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, আদিগন্ত সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের পথে হাঁটাই বর্তমানের বড় চাওয়া। তার ফলশ্রুতিতেই বেশ কিছু সিদ্ধান্তগ্রহণ নতুন সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঢাকা সফরও তাই তাত্পর্যপূর্ণ। এই সফরের প্রাক্কালে ইতিমধ্যে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা সমস্যারও সমাধানে আন্তরিক দুই দেশের সরকার।
দীর্ঘদিনের সমস্যা স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন ঘটছে, যা বাংলাদেশ-ভারত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এ ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি ‘স্থলসীমান্ত চুক্তিঃপ্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক সেমিনারে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ যথার্থই বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত একসঙ্গে কাজ করেছে বলেই স্থলসীমান্ত চুক্তির বাসত্মবায়ন সম্ভব হয়েছে। সামনের দিনে এ অঞ্চলের মানুষের উন্নয়নে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। আর দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলে সাফল্য আসবেই।’
বিশ্বায়ন ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট যা, তাতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ এখন ভারতের কাউন্টার টেরোরিজমে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসাবে কাজ করছে। দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি, বাণিজ্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বিভিন্ন সময়ে বৈঠক আহ্বান করা, যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন (জেইসি), যৌথ নদী কমিশন, নৌবাণিজ্য ও ট্রানজিট চুক্তিসহ আরো নানান সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত রয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কারণে এগুলো অকার্যকর ছিল। তবে ২০১০ সালের পর থেকে নতুন করে উদ্যোগ নেয়ায় পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতার মাত্রা বেড়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর জন্য ভারত ঋণসহায়তাও দিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্তৃতি ঘটিয়ে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে উভয়ই লাভবান হওয়ার প্রক্রিয়া মূলত: শুরু হয়ে গেছে। এতে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। প্রতিযোগিতা না বাড়লে দক্ষতা বাড়বে না। সেদিক থেকে বাংলাদেশের জন্য বরং সুবিধাই হয়েছে। যদিও অনেকের অভিমত, বাংলাদেশের সঙ্গে দিন দিন বাণিজ্য যেমন বাড়ছে, তেমনি ঘাটতিও বাড়ছে।
স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময়েও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি থেকেই গেছে। বাংলাদেশ সব ধরনের পণ্য (মদ ও তামাকজাতীয় ছাড়া) শুল্কমুক্তভাবে ভারতে রফতানি করতে পারে। এমন সুযোগ থাকায় রফতানি বাড়ার কথা হলেও তা বাড়ছে না। বরং কমছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতে রফতানি করার মতো পর্যাপ্ত পণ্য এদেশে নেই। আর এদেশ থেকে যেসব পণ্য রফতানি হয় সেগুলো ভারতেও উত্পাদিত হয়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে তিন কোটি ১০ লাখ ডলারের পণ্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়। আর ঐ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি হয় ১৮ কোটি ছয় লাখ ডলার। অর্থাত্ সে বছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫৭ কোটি ৮১ লাখ ডলার। এ অর্থবছরে ভারতে রফতানি হয়েছে ৪৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের অপরদিকে আমদানি হয়েছে ৬০৩ কোটি ৪৮ লাখ ডলারের।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, কৃষি পণ্য, গার্মেন্টস, চামড়া, রাসায়নিক দ্রব্য প্রভৃতি রফতানি হয়। অপরদিকে ভারত থেকে টেক্সটাইল ও টেক্সটাইলের কাঁচামাল, বিভিন্ন ধরনের গাড়ি ও ট্রান্সপোর্ট সামগ্রি, শাকসব্জি, মেশিনারী ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য, খনিজ দ্রব্য, প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক পণ্য, ফুড ও বেভারেজ প্রভৃতি আমদানি হয়ে থাকে।
একথা সত্যি যে, বাংলাদেশ এখন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রফতানির দেশে পরিণত হয়েছে। প্রকারান্তরে, বাংলাদেশের রফতানিও বিগত বছরগুলোতে বেড়েছে, কমেনি। কিন্তু সমানতালে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। যেকোন দেশের সঙ্গেই ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত যাই হোক না কেন, দেখতে হবে সেটি অর্থনীতির জন্য কতটা দরকারি। কখনো কখনো আমদানি বেশি হলেও যদি সেটি প্রয়োজনীয় হয় এবং অর্থনীতির স্বার্থের অনুকূলে হয় তাহলে ক্ষতির কিছু নেই। তদুপরি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে অংশীদার দেশের কাছ থেকে নানা ভাবে পুষিয়ে নেয়া যায়। যেমন, বাংলাদেশ আঞ্চলিক কিংবা দ্বিপাক্ষিকভাবেও ভারতের কাছ থেকে সুবিধা প্রাপ্য হতে পারে। কিন্তু রফতানিযোগ্য পণ্য সীমিত হওয়ায় সেই সুযোগটি গ্রহণ করতে পারছে না। ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লী সফরকালে ‘কম্প্রিহেনসিভ ফ্রেমওয়ার্ক অফ কো—অপারেশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ নিয়ে সমঝোতা হয় এবং সেখানে আরো কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। যার মধ্যে ছিল পানি সম্পদ, বিদ্যুত্-জ্বালানি, পরিবহন ও আন্তঃসংযোগ, পর্যটন ও শিক্ষাখাতে সমন্বিত উন্নয়ন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে দু’দেশের মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়ন নিয়ে কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তাতে আলোচ্য ইস্যুগুলোর বাস্তবায়নে যৌথ পরামর্শক কমিশন গঠনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। যার আলোকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ অন্যান্য বিষয়ও এগিয়ে নেয়ার বিষয়টি সহজতর করা হয়েছে।
বাংলাদেশের উচিত উত্পাদনখাতের সম্প্রসারণ করা। নতুন নতুন পণ্যকে রফতানিযোগ্য করা কিংবা বিনিয়োগ বাড়াতে সচেষ্ট হওয়া। এ ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকেই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দাবি করতে পারে বাংলাদেশ। যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশে শিল্পস্থাপন করলে তা বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে আরো সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।