প্রবল কর্মতত্পরতা নরেন্দ্র মোদীকে ইতিহাসের সর্বাধিক সফরকারী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীতে পরিণত করেছে— যার লক্ষ্য হলো ভারতকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের মূলধারায় নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে মোদীর সফর তারই অংশ। ভারতের আগের সরকার প্রধানরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের অবস্থান জানান দিতে তেমন পদক্ষেপ না নিলেও নরেন্দ্র মোদী বিষয়টিকে হয়তো বেশ গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করছেন।
ভারত তার গুরুত্বের তুলনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক কম শক্তি প্রয়োগ করেছে। নেহেরু যুগের তুলনামূলক নিষ্ক্রিয় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিত্রতার ধারাবাহিতকতা এমন একটা পর্যায়ে ছিলো যাতে ভারতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও প্রকট হতে পারেনি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে আফগানিস্তানে শান্তি সন্ধানে ভারতের সহযোগিতার কথা। আফগানিস্তানে শান্তি সন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেমন প্রচার পায়নি।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সর্বশেষ ব্যাপকভাবে সারা বিশ্বের নিজের দাপট দেখিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী। সত্তর দশকের প্রথম দিকে ইন্দিরা গান্ধী তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের ঢল সামাল দেয়ার জন্য গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। শরণার্থীদের জন্য আশ্রয়, খাবারসহ তাদের যাবতীয় দায় দায়িত্ব পালনে তখন তিনি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সবার কাছে সাহায্যের আহবান জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক পর্যায়ে সেনা পাঠিয়েও বাংলাদেশের প্রতি তাঁর সমর্থনের প্রমাণ দিয়েছিলেন।
বিশ্বের জনবহুল দুইটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মিল বেশি। কিন্তু দেশ দুইটির মধ্যকার সম্পর্ক বেশিরভাগ সময়েই অস্বস্তিকর, বিশেষ করে যখন রিপাবলিকানরা ওয়াশিংটন নিয়ন্ত্রণ করে। সমপ্রতি এই অস্বস্তি কেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, গণতন্ত্রের মিল দেশ দুইটিকে কাছাকাছি আনতে পারেনি। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে চীন। চীনের ধারাবাহিক উত্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত জোট বাধতে বাধ্য হয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তির সাথে ভারসাম্য রাখতেই ওবামা-মোদী সুসম্পর্ক রাখার প্রতি বেশি মনোযোগী। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক প্রভাব ও দেশটির দ্রুত সম্প্রসারণশীল ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ শক্তির সাথে বোঝাপড়ার প্রয়োজনেই সহযোগিতার ক্ষেত্র খুজঁছে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ভারতই নিজেদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে প্রতিযোগিতায় নামেনি। চীন-ভারতও নিজেদের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ মনোযোগী। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব কৌশলগত পরিকল্পনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরালো করতে চাইছেন চীনে ভারতের পণ্যের নতুন বাজারের আশায়। তবে চীন-ভারতের মধ্যকার সীমান্তের কারণে যে কোন সময়েই দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। একমাত্র এই কারণেই যে কোন সময় দুই প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠতে পারে।
মূলত পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া ইস্যুতে এই তিন পরাশক্তির মধ্যে দুই জন চাইছে নিজেদের মধ্যে জোট করে তৃতীয় পক্ষকে দূর্বল করতে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেই নিজেদের কৌশলের প্রতি মনোযোগী। চীন ও ভারত উভয়েই তাদের সামরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং নিজেদের বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে একে অন্যের সাথে সম্পর্ক জোরালো করতে চাইছে। তবে কৌশলগত কারণে চীন ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখতে ভুলে যায়নি।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তানের এই বহুমাত্রিক নাট্যমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়? আগামী সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ সফরে আসছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী। একজন বাংলাদেশি পর্যবেক্ষকের মতে, বাংলাদেশকে কাছে টানার ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের মধ্যে অঘোষিত অথচ সুস্পষ্ট একটি প্রতিযোগিতা রয়েছে। এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের বাজার দখল ও অবকাঠামোর বড় বড় প্রকল্পের কাজ পাওয়া। পাকিস্তান সফরে শি জিন পিং ৪৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ সফরে চীনা প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের ঘোষণা দিবেন। বাংলাদেশ সফরে নরেন্দ্র মোদী সঙ্গে করে নিয়ে আসছেন পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকেও। মূলত আগামী সেপ্টেম্বরে চীনা প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কারণেই নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর হয়ে উঠেছে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : মার্কিন সাংবাদিক