বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা ভারতীয় নারী পাচার চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা হবে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার সীমান্ত চুক্তির পর এই নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে দুই দেশের গোয়েন্দা পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে।
মূলত এই নেটওয়ার্কের ফাঁদে বেশি পড়েছে মফস্বলের উঠতি বয়সী মেয়েরা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় এই দালালরা প্রথমে একটি নারীকে টার্গেট করে। এরপর ওই নারীকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে ভারতে নিয়ে যায়। এভাবে দালাল চক্রের হাত থেকে নারীরা পৌঁছে যায় মূল পাচার চক্রের হাতে।
বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার জরিপ থেকে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে কেবল ভারতেই পাঁচ লাখ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩ লাখ নারী ও শিশু পাচার করে ভারতে নেয়া হয়েছে। একই সময়ে পাকিস্তানে পাচার হয়েছে ২ লাখ নারী ও শিশু। পাচার হওয়া এসব নারী ও শিশুর বয়স ১২ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০০ নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে। এসব নারী-শিশুর ৬০ ভাগ কিশোরীর বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। ভারতের একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও শিশু ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে থাকে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভারতীয় একটি চক্র তাদের দালালদের মাধ্যমে নারী সংগ্রহ করছে। প্রতি নারীর জন্য দেয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। পরে ওই নারীদের ভারতের মুম্বাই, হায়দারাবাদ ও কলকাতার বিভিন্ন নিষিদ্ধ পল্লী এবং আবাসিক হোটেলে জোরপূর্বক দেহ ব্যবসা করানো হচ্ছে। আবার কোনো কোনো নারীকে বিত্তশালী ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করছে।
জানা গেছে, দেশের ১৮টি রুট দিয়ে প্রতি বছর পাচারের শিকার বেশিরভাগ নারীর স্থান হয় ভারতের পতিতাপল্লীতে। জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন পতিতাপল্লীতে প্রায় ৫ লাখ যৌনকর্মী রয়েছে। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশি। বিয়ে, চাকরি এবং আর্থিক প্রলোভনে পড়েই এসব নারী পাচারের শিকার হয়ে থাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মানব পাচারকারীরা অত্যন্ত শক্তিশালী চক্র। তাদের সঙ্গে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। এ কাজের জন্য মাসিক বেতনে দালালও নিয়োগ দেয়া রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় এসব দালাল সক্রিয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৪ হাজার ২শ ২২ কিলোমিটার এবং মিয়ানমারের সাথে ২শ ৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। পাচারকারীরা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের পাচার করে। উত্তরের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সীমান্তপথ দিয়ে নারী ও শিশুদের পাচার করা হয়। ওই অঞ্চলের সীমান্ত এলাকার ১১টি রুট দিয়ে নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য যশোরের বেনাপোল সীমানা অত্যন্ত সহজ রুট। বেনাপোল থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহর।
প্রথমে পাচার করা নারী ও শিশুদের এ শহরে রাখা হয়। পরে পাচারকারীদের সুবিধামতো তাদের অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। যশোর থেকে পাচারকারীরা ভোমরা, কলারোয়া, দর্শনা, জীবননগর ও ঝাউডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে। দক্ষিণ-পশ্চিমের সীমান্তবর্তী ফরিদপুর, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, কুষ্টিয়া, যশোরের ঝিকরগাছা, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, পার্বত্যাঞ্চলের কক্সবাজার ইত্যাদি জেলা পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে।
এদিকে মানব পাচার প্রতিরোধে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার একটি আইন করে। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এর আওতায় জেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মামলা পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে। তবুও থেমে নেই মানব পাচার। আর এই পাচারের শিকার হওয়াদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু।