নিরাপদ সীমান্ত গড়ে তুলতে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনী একমত

চোরাইপথে গরু আনাকে কেন্দ্র করে বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে মাঝে মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটছে। বৈধপথের চেয়ে অবৈধপথে আনা ভারতীয় গরুতে লাভ বেশি। তবে সম্প্রতি ভারত থেকে গরু না ছাড়ার এক ঘোষণাতেই বড় ধাক্কা লেগেছে বাংলাদেশের পশুর বাজারে। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকায় প্রতি মাসেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গরুর মাংসের দাম। তাই চোরাকারবারিরা ভারত থেকে চোরাইপথে গরু আমদানি করতে তত্পর। শুধু গরু  নয়, মাদক, মসলা, কাপড়, চিনি, লবণ, আগ্নেয়াস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স পণ্যসহ অন্যান্য সামগ্রী আসছে চোরাইপথে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকেও চোরাই পথে বিভিন্ন সামগ্রীও ঢুকছে ভারতে। এসব চোরাই পণ্য আনা-নেয়া হচ্ছে সীমান্তের বেশ কিছু পয়েন্ট দিয়ে। আর সেই সব পয়েন্টেই মাঝে মধ্যেই গুলির ঘটনা ঘটছে।

 
দুই দেশের সীমান্ত দিয়ে এসব অবৈধ পণ্য চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি ও বিএসএফ তত্পর। দুই দেশের সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্ত পর্যায়ে বহু আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। প্রতিবছর ঢাকায় ও দিল্লীতে দুই বার দুই সীমান্ত বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বৈঠকে কোনো না কোনো বিষয়ে অগ্রগতি হয়। বৈঠকগুলোতে সীমান্ত এলাকায় নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের গুলি, আহত, হত্যা করা, বাংলাদেশি নাগরিকদের অপহরণ, আটক, অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম, অস্ত্র ও গোলা-বারুদ পাচার, সীমান্তের অপর প্রান্ত থেকে বাংলাদেশে ফেন্সিডিলসহ মাদক চোরাচালান বন্ধ, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে উন্নয়নমূলক নির্মাণ কাজ, উভয় দেশের সীমান্তে নদীর তীর সংরক্ষণ কাজে সহায়তা এবং উভয় বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
 
গত বছরের আগষ্টে ভারতের নয়াদিল্লীতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ে ৩৯ তম সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিজিবি ও বিএসএফ দু’দেশের সীমান্তে সহিংস ঘটনা রোধ ও সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসার জন্য অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ, বিশেষ করে গরু চোরাচালানের স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে রাত্রিকালীন যৌথ সমন্বিত টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুই দেশের সীমান্তে অস্ত্র, মাদক, গরু, জাল নোট ও স্বর্ণ চোরাচালান প্রতিরোধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বলা হয়, এসবের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি ৬ মাস অন্তর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হবে। উভয় পক্ষই সীমান্ত ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য একমত হয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেয়।
 
সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদ সীমান্তে ফেলানী হত্যার নিরপেক্ষ বিচারের দাবির প্রেক্ষিতে বিএসএফ মহাপরিচালক আশ্বাস দেন যে, ফেলানী হত্যার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার হবে। ভারত সীমান্ত হত্যা শূন্য পর্যায়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে বিএসএফ মহাপরিচালক বলেন, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। সীমান্ত ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরো ভাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
 
সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে ঢাকায় বিজিবি সদর দফতরে দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের ৪০তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে দুই দেশ একমত পোষণ করে। সেই সঙ্গে চোরাচালানের ক্ষেত্রেও জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়। যৌথ দ্রুত টহল জোরদারসহ পারস্পরিক নানা বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়। দুই দেশের সীমান্তরক্ষীরা মিলেমিশে সীমান্ত অপরাধ রোধে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে এক প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ প্রধান বলেন, ফেলানী হত্যার পুনঃবিচার চলছে।
 
বিজিবি-বিএসএফ যৗথ উদ্যোগে সীমান্ত হত্যা জিরো টলারেন্সে নামিয়ে আনার কথা বললেও তা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত গত ৫ মাসে সীমান্তে নিহত হয়েছেন ২৫ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ জন এবং অপহরণের শিকার হয়েছেন ৩৯ জন। এর আগে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিএসএফের গুলিতে বিভিন্ন সীমান্তে ১ হাজার ৩৫ জন বাংলাদেশি নিহত ও ৯১৯ জন আহত হয়েছেন।
 
এ ব্যাপারে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেন, সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বিজিবি’র সদিচ্ছা ও চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। বিএসএফের পক্ষ থেকেও চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। উভয় দেশ চেষ্টা করে যাচ্ছে কীভাবে এসব ঘটনা কমিয়ে আনা যায়। আগের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, সীমান্তে হত্যা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।