প্রতিবেশী দুটি দেশের মানুষের ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত এলাকায় কেনাবেচার সুযোগ করে দিতে ২০১৩ সালে প্রথম চালু হয় সীমান্ত হাট। সপ্তাহের একদিন সীমান্তের উভয় অংশের মানুষ এ হাটে এসে ক্রয়-বিক্রয়ের সুযোগ পান। ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি আত্মীয়তার বন্ধন থাকলেও সীমানার এক পারের মানুষ চাইলেই আরেক পারের আত্মীয়কে দেখতে পান না। চাইলেই ওপারের কোনো পণ্য কিনতে পারতেন না। সীমান্ত হাট এসব মানুষকে অন্তত সপ্তাহে একদিন একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি এ হাট সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বন্ধেরও সুযোগ তৈরি করেছে। সীমান্ত সংলগ্ন দুই পারের মানুষই এতে দারুণ খুশি। এমন সুযোগ করে দেয়ায় দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
সীমান্ত হাটের এ উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। ২০০৫ সালে বাংলাদেশকে সীমান্ত হাট স্থাপনের প্রথম প্রস্তাব দেয় ভারত। বাংলাদেশ তখন এ বিষয়ে ভারতকে একটি ধারণাপত্র দিতে অনুরোধ জানায়। ভারত ধারণাপত্রটি পাঠায় ২০০৭ সালে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ ইস্যুটি আবার গতি পায়।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলার বালিয়ামারী ও ভারতের পশ্চিম গারো হিলের কালাইরচর সীমান্তে প্রথম সীমান্ত হাট চালু হয় ২০১১ সালে। সুনামগঞ্জের ডলোরার ও ভারতের বালাত সীমান্তে অপর হাটটিও চালু হয় সমসাময়িক সময়ে। ফেনীর ছাগলনাইয়া-শ্রীনগর সীমান্ত এলাকায় তৃতীয় হাট চালু হয় চলতি বছরের শুরুতে। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরকালে চতুর্থ সীমান্ত হাট চালু হবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়। ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর এ হাট উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। নানা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করে গত বছরের মে মাসে সীমান্ত হাটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল। ওই বছরের আগস্ট মাসের মধ্যে এই সীমান্ত হাটের সব অবকাঠামো নির্মাণ করে চালুর কথা থাকলেও নানা কারণে তা হয়নি। অবশেষে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই তা চালু হতে যাচ্ছে। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে ৯ টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা) এই হাট ছয় ঘণ্টার জন্য বসবে।
সীমান্ত হাট চুক্তি অনুযায়ী, সীমান্তের ৫ কিলোমিটারের অভ্যন্তরের লোকজন এখানে কেনাবেচা করতে পারবেন। তাদের কোন ভিসা পাসপোর্ট লাগবে না। একজন ক্রেতা ১শ’ ডলার সমপরিমাণ পণ্য কিনতে পারবেন। এ জন্য শুল্ক দিতে হবে না। তবে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে পরিচয়পত্র নিতে হবে। সপ্তাহে হাট বসে একদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এ হাটে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে।
সর্বশেষ চালু হওয়া ফেনীর ছাগলনাইয়ার সীমান্ত হাট সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এটি চালু হওয়ার পর উভয় সীমান্তের উভয় অংশের ক্রেতা-বিক্রেতার আগ্রহ বেড়েছে। সপ্তাহে মঙ্গলবার এ হাট বসে। হাটের দিন উভয় দেশের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এ হাট। স্থানীয় একজন ক্রেতা বললেন, এলাকায় এখন প্রতি শ’ লিচুর দাম আড়াই শ’ টাকা। আর সীমান্ত হাটে ভারতের ক্রেতাদের কাছ থেকে তা ১শ’ টাকায় কেনা যায়। স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবি, এটি যেন দুই দিন করা হয়। তবে এপারের বাসিন্দাদের কিছু সমস্যাও রয়েছে। এছাড়া অন্য দুটি সীমান্ত হাটেও পণ্য বেচাকেনায় কিছু বিধি নিষেধে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই সমস্যায় পড়ছেন। ‘স্থানীয় উত্পাদিত পণ্য’ শব্দ নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি।
তবে এসব ছোট-খাট চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেই এগিয়ে যাচ্ছে সীমান্ত হাট। ফলে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় নতুন করে এ হাট চালু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ৮ জেলায় আরো ১৪টি সীমান্ত হাট স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।
নতুন ১৪টি সীমান্ত হাটের স্থানগুলো হলো কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোলাশালা ইউনিয়নের জগমোহনপুর গ্রাম, কুষ্টিয়ায় দৌলতপুর রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামের দক্ষিণ অংশ, রাজশাহীর গোদাগাড়ী চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের সীমানা পিলার ৪১/৩ এবং ৪১/৪ - এর মধ্যবর্তী স্থান, নওগাঁর সাপাহার শিরন্টি মৌজার খঞ্জন সীমান্ত, নওগাঁর ধামইরহাট কালুপাড়া মৌজার কালুপাড়া সীমান্ত, নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার শীতল বাজার সীমান্ত, রাধানগর মৌজার সীমান্ত, শাওলি সীমান্ত, তালতলা পাড়া শাওলি সীমান্ত, ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট গাজীর ভিটা ইউনিয়নের উত্তর নলকুড়া সীমান্ত, ঝিনাইদহ মহেশপুর যাদবপুর ইউনিয়নের গোপালপুর মৌজা, নেত্রকোনা কলমাকান্দা পাঁচগাঁও এবং নেত্রকোনা দুর্গাপুর বিজয়পুর সীমান্তে। এর আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত মেঘালয় সীমান্তে ভারত সরকার সম্ভাব্য ২২টি সীমান্ত হাটের তালিকা দিয়েছিল।