বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নীতির উপর গড়ে উঠেছে

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির উপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নিরীহ ও নিরস্ত্র জনগণের উপর একটি অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও জনগণের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর আগে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রতিরোধ সংগ্রাম একটি জনযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে প্রতিটি শহর, জেলা, থানা, ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা ও গৃহ একেকটি দুর্গে পরিণত হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য একদিকে যেমন অস্ত্র-গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল, পাশাপাশি সার্বিক জনযুদ্ধকে সমন্বিত করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও কমান্ড গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সাংবিধানিক বৈধ সরকার গঠন করা।

 
বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতের ভূ-খণ্ডে পুনঃসংগঠিত হয়ে ভারী অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণসহ বাংলাদেশের চারপাশে ক্যাম্প গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ প্রয়োজনীয় বিষয়ে ভারতের রাজনৈতিক পর্যায়ে পূর্বে কোনো আলোচনা বা ধারণা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয় ও কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী ও তাজউদ্দিন আহমদের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠক। ওই বৈঠকে আমাদের সরকার গঠনের অপরিহার্যতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এসব বিষয়ে সার্বিক একটি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের মূল বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
 
প্রথমত, আমাদের এই যুদ্ধে অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসসহ সার্বিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এই যুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের। এটি যাতে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পরিণত না হয় এবং আন্তর্জাতিকীকরণ না হতে পারে তার জন্যও সতর্ক থাকতে হয়েছে। যার নেতৃত্বে এই যুদ্ধ করছি, অর্থাত্ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কারণ তখন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। এই যুদ্ধের সপক্ষে প্রচার-প্রচারণা করার জন্য বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রতিটি দেশের রাজধানীতে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য ভারতের কূটনৈতিক তত্পরতা ছিল অত্যন্ত জরুরি।
 
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ধারাবাহিকতায় এবং তার ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতে তৈরি হয় ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্র। ওই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক দলিল ও বাংলাদেশ সংবিধানের মূল উত্স। ওই ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। ভারত সরকার এবং জনগণ সার্বিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে সমর্থন, সহযোগিতা ও সাহায্য করেছেন এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে খুবই বিরল। ইন্ধিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণ বাংলাদেশের জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। শুধু বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা ও সমর্থনই করেননি তারা, এদেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
 
ইন্ধিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দিন আহমদের প্রথম বৈঠকে যে আলোচনা হয় তাতে তাজউদ্দিন বলেন, এক কোটি শরণার্থী এখানে আসবে এবং তাদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। তেমনটিই ঘটেছিল পরবর্তীকালে। পার্বত্য ত্রিপুরার লোক সংখ্যার চাইতে সেখানে আমাদের শরণার্থীর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। এ রকম একটি অবস্থায় ভারতের জনগণ ও ভারত সরকার যে মানবতা নিয়ে সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। ধর্ম-বর্ণ-জাতি ও রাষ্ট্রীয় সীমারেখার ঊর্ধ্বে উঠে ‘মানুষ মানুষের জন্য’ বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। আমাদের বিপদের দিনে এই বন্ধুত্ব তাই কষ্টি পাথরে খোদাই করা ইতিহাসের অন্তরাত্মায় লুকিয়ে আছে।
 
বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ভারতবর্ষের বিশেষ করে বাংলাদেশ সীমান্তের চারপাশ ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় এই চারটি প্রদেশের মানুষ অপরিসীম সহযোগিতা ও সহানুভূতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমাদের কষ্টভোগের অংশীদার হয়েছেন।
 
বাংলাদেশের সাথে তার প্রতিবেশীদের সম্পর্ক একটি মানবিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। যা ঐতিহাসিকভাবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটি তাই প্রতিষ্ঠিত নীতির উপর গড়ে উঠেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র চেতনায় মানবিক মূল্যবোধে ও আন্তর্জাতিক মৌলিক অধিকারের নীতিমালার উপর আমাদের দুটি রাষ্ট্রের ও জনগণের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা বিরাজমান। দুটি দেশের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের বিষয়টিও এই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন লাভের জন্য ভারতবর্ষ ও সারা পৃথিবীতে সকল বাঙালি ও ভারতীয় জনগণ শক্তি জুগিয়েছেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ সমর্থন প্রতিফলিত হয়েছে কবি-লেখক-গীতিকার-সুরকারদের সঙ্গীতালোকে।
 
পৃথিবী তখন দুটি বলয়ে বিভক্ত। একটি আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিসূমহ, যারা পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আমাদের যে সাংবিধানিক ও মানবিক যৌক্তিকতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এবং দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের লেখনী ও প্রচারে তা স্থান পেয়েছিল। এই প্রচারে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীন হওয়ার যৌক্তিকতা এবং সাংবিধানিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক ভিত্তির যৌক্তিকতা পৃথিবীর সাধারণ মানুষের কাছে এমনকি আমেরিকার জনগণ ও সিনেটরদের সামনে উপস্থাপিত হয়।
 
আমেরিকা এরমধ্যে পাকিস্তানের দূতিয়ালির মাধ্যমে কিসিঞ্জার প্রশাসন চীনের সাথে তাদের গাঁটছড়া তৈরি করে। ফলে প্রয়োজন হয় এই অঞ্চলের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন। ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নও বাংলাদেশের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
 
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের চুক্তি করতে হয় যাতে চীন ও পাকিস্তানের সম্ভাব্য আক্রমণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারত-বাংলাদেশের পক্ষে স্থান নেবে। একইভাবে ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি চুক্তি হয়। চুক্তির বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশের সরকারকে তারা সহযোগিতা ও স্বীকৃতি দেবে। যার ফলে এখানে একটি যৌথ কমান্ড তৈরি হয়। সেই যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। চুক্তি অনুযায়ী যখনই বাংলাদেশ সরকার ইচ্ছে প্রকাশ করবে তখনই ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে ফিরে যাবে।
 
বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারকে ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যে সহযোগিতা ভারত সরকার ও সেদেশের জনগণ করেছে এটি একটি দুর্লভ ঐতিহাসিক ঘটনা। অন্যায়, বর্বরতা, সহিংসতা, গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ ও যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের দুটি রাষ্ট্রের যে যৌথ অবস্থান ’৭১-এ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটি শুধু আমাদের রাষ্ট্রদুটির সম্পর্কের ভিত্তিই নয়, ওই মৌলিক নীতিগুলো, আমাদের জাতিপুঞ্জের নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের উপর ভিত্তি করে একটি ঐতিহাসিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি আমাদের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রযাত্রার পথে দিক-নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
 
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় তাই আমরা এই মূল্যবোধকে স্থায়ী রূপ দিয়েছি এবং আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছি যে, ‘আমরা যাতে স্বাধীন সত্তায় সমৃদ্ধি লাভ করতে পারি এবং মানবজাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সংগতি রক্ষা করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি।’
 
বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পারিক সমস্যা সমাধানে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটছে স্থল সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস এই মৌলিক মানবতাবোধ থেকে উদ্ভূত। এদেশের জনগণ এবং ভারতের জনগণ ও দুই দেশের সরকার যুদ্ধকালীন অবস্থায় যে সকল মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার মাধ্যমে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। এক বিংশ শতাব্দীর উন্নয়ন সম্ভাবনায়ও এই দুটি দেশ তেমনিভাবে সহযোগিতার ক্ষেত্রে এবং মৌলিক আন্তর্জাতিক নীতিমালার ভিত্তিতে সব বাধা অতিক্রম করে এ অঞ্চলের জনগণের জন্য সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি, জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পরস্পরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেবে। দু’ দেশের জনগণের এটাই প্রত্যাশা।
 
 
 
[লেখক :স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের রচয়িতা ও মুজিবনগর সরকার গঠনের মূল সংগঠক]
 
 
 

(অনুলিখন :দিদারুল আলম)