বাংলাদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্য একসাথে চলার সংকল্প করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন বাস্তবায়নে সহযাত্রী হবার ঘোষণা দিয়ে বলেন, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ও আমার চিন্তা, ধ্যান ও স্বপ্ন এক। শেখ হাসিনা বিকাশ চান, আমিও চাই উন্নতি। ২০২১ সালে বাংলাদেশ আরো উন্নতির টার্গেট নিয়েছে। ভারত এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের সাথে থাকবে।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় সুধী সমাবেশে একথা বলেন নরেন্দ্র মোদী। এক ঘন্টা পাঁচ মিনিটের ভাষণে মোদী সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুত্, পানি, নিরাপত্তাসহ সব ইস্যু নিয়ে খোলামেলা ও প্রাণবন্তভাবে তার চিন্তা ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। ৩৪ ঘন্টার বাংলাদেশ সফরের শেষ পর্বে মোদী আবারও এখানে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ভারতীয় হাইকমিশনের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই সুধী সমাবেশ আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ.আ.ম.স আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে স্বাগত ভাষণ দেন। সুধী সমাবেশে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিক, গবেষক, শিক্ষক, বিশিষ্ট নাগরিক, কূটনীতিকসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক পদ্ম ভূষণ পদকপ্রাপ্ত ড. আনিসুজ্জামান, পদ্মশ্রী পদকপ্রাপ্ত ঝর্নাধারা চৌধুরী অনুষ্ঠানের সামনের সারিতে উপবিষ্ট ছিলেন।
স্বভাব সুলভ দৃঢ়চেতা ও বিনয়ী নরেন্দ্র মোদী বক্তৃতায় উপস্থিত তরুণ ও যুব সমাজের জন্য প্রেরণামূলক বিষয় তুলে ধরেন। সুধী মণ্ডলীর মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে মোদী বক্তৃতা শুরু ও শেষ করেন বাংলায়। পুরো হিন্দী ভাষায় বক্তৃতা গণমাধ্যমে ও হেডফোনের সাহায্যে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়। নরেন্দ্র মোদী বলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী। বাংলাদেশের কেবল আশেপাশে থাকব না। সাথে সাথেও থাকব। উন্নতির সহযাত্রী হব। একই সাথে আছি। বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর প্রসঙ্গ তুলে মোদী বলেন, ভারত রত্ন বাজপেয়ীর পথ ধরে রাজনীতিতে আছি। বঙ্গবন্ধুর কন্যার উপস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি বাজপেয়ীকে সম্মানিত করেছেন। যুবক বয়সে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অত্যাচারের খবর শুনে রক্ত গরম হয়ে যেত। দিল্লীতে তখন স্বাধীনতার পক্ষে সত্যগ্রহ কর্মসূচিতে যোগ দেই। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ উন্নয়ন আর বিকাশের পথে এগুচ্ছে। সবক্ষেত্রে বাংলাদেশ দারুণ কাজ করছে।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী তার চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, একটি বড় কোম্পানীর প্রধান কর্ণধার আমাকে বললেন, আমাদের পাশের ১৭ কোটি মানুষের দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। একথা আমার খুবই আনন্দ লেগেছিল। গর্ব হয় এজন্য। সূর্য আগে বাংলাদেশে উঠে আমরা কিরণ পাই। এখানে যত আলো আসুক আমাদের কাছে তা পৌঁছবেই। ভারতের অনেক রাজ্যকে বাংলাদেশ থেকে শিখতে হবে।
তিনি বলেন, এদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সৈন্যরা রক্ত দেয়। এর চেয়ে বড় সুখের আর কী হতে পারে? মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাই এদেশে ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশ দুটি দেশ কিন্তু একটি বিষয়ে খুবই মিল সৌভাগ্যবানও বটে। দু’দেশেই ৬৫ শতাংশ মানুষ ৩৫ বছরের কম বয়সী। তরুণ ও যুবকদের যথাযথ বিকাশ হতে হবে। বাংলাদেশের বিকাশ যাত্রা কখনো থামবে না। একসময় এ বিশ্বে শক্তি ও ধন দিয়ে ক্ষমতা মাপা হত। এখন উন্নয়ন ও বিকাশ গুরুত্ব পায়। দু’দেশের সীমান্তের জমি নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ বিবাদ হয়। অথচ আমরা নির্বিবাদে সব করেছি। মনকে জয় করেছি।
নরেন্দ্র মোদী আরো বলেন, আমরা দুই দেশ উন্নতি আর বিকাশের জন্য লড়ব। আমরা গরিব সত্ত্বেও একসাথে বিকাশের পথে এগিয়ে যাব। এখানকার তরুণদের শক্তি আছে। বিশ্বকে তারা নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। আমরা চারজাতি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে সংযোগ স্থাপন করব। ইউরোপের উন্নতির পেছনে রয়েছে সহজ যোগাযোগ আমরাও তাই করব। বাংলাদেশ ও ভারত রেল, সড়ক, বিমান ও সমুদ্র পথে সরাসরি যুক্ত হবো। আগে সিঙ্গাপুর হয়ে বাংলাদেশে পণ্য পাঠাতাম, এখন সরাসরি পাঠাব। আজকের বিশ্বে কোন দেশ ধন, অস্ত্র আর শক্তিতে যত বড়ই হোক অপর দেশের সহায়তা ছাড়া চলতে পারে না। তাই আমাদের দু’দেশের লক্ষ্য এক ঠিক করেছি। ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা করেছি। স্যাটেলাইট দিয়ে দেখলে এ অঞ্চলকে অন্ধকার দেখা যায়। তাই বিদ্যুত্ নিয়ে একসাথে কাজ করলে এ অঞ্চলে কোন অন্ধকার থাকবে না। ত্রিপুরার পালাটানায় বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশ সহায়তা দিয়েছে এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশকে আমরা বিদ্যুত্ দিচ্ছি। দু’দেশ সৌর বিদ্যুত্ নিয়েও কাজ করব। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করবে। আমরাও এতে যুক্ত হব। বাংলাদেশ মহিলাদের উন্নয়নে যা করেছে তা খুবই প্রশংসার। এখানকার নেতৃত্বের সবাই মহিলা, এটা গর্বের। পৃথিবীতে এটা বিরল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডে মহিলা নেতৃত্ব। মহিলা ক্রিকেটার সালমা খাতুন, এভারেস্ট বিজয়ী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়ার জন্য আমরা গর্বিত।
নরেন্দ্র মোদী আরো বলেন, পানি, পাখি ও বাতাসের চলাচলে কোন বাধা নেই, ভিসা লাগে না। পানি নিয়ে মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে একজোট হয়ে কাজ করব। একজোট হয়ে তিস্তার জন্য করব। আস্থা রাখতে হবে। বিশ্বাস টলে গেলে চলবে না। সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে পাচার, বেআইনি চলাচল, জাল নোট তৈরির কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ এজন্য কাজ করে যাচ্ছে। আজ আমরা একসাথে চললে কাল যাতে একসাথে দৌড়াতে পারি সেজন্য কাজ করব। বাণিজ্যের ঘাটতি দূর করতে এখানে আরো বিনিয়োগ হবে।