ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে দেয়া ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ গ্রহণ করেছেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গতকাল রবিবার সফরের শেষদিন দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এ সম্মাননা হস্তান্তর করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। সম্মাননা গ্রহণের পর দেয়া বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদী বলেন, অটল বিহারী বাজপেয়ী তার সারা জীবন দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্য এই মহান নেতাকে বাংলাদেশ আজ সম্মানিত করছে। এটা আমার জন্য এক সৌভাগ্যের মুহূর্ত। ভারতবাসীর জন্যও এক গৌরবের মুহূর্ত। অটল বিহারী বাজপেয়ী যিনি আমার মতো অনেকের জন্য প্রেরণা, এমন ভারতরত্নকে আজ বাংলাদেশ সম্মানিত করছে। যে স্বপ্নের জন্য গৌরবময় লড়াই আপনারা লড়েছিলেন, যা কোটি ভারতীয় হূদয় থেকে চেয়েছিল, ওই স্বপ্নের বাস্তবায়ন আমিও চেয়েছিলাম। দুই দেশের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, আমাদের সংকল্প করতে হবে এই সম্পর্ক যেন অটুট থাকে।
নরেন্দ্র মোদী ছাড়াও রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, বিরোধী রাজনীতিতে থেকেও অটল বিহারী বাজপেয়ী বাংলাদেশের সমর্থনের জন্য কাজ করেছেন। তাকে সম্মাননা দেয়াটা আমাদের কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া অটল বিহারীকে দেয়া সম্মাননা স্মারক পাঠ করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ এবং রাষ্ট্রপতির দেয়া মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নিতে দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু পরে নরেন্দ্র মোদী বঙ্গভবনে পৌঁছান। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ মোদীকে স্বাগত জানান। পরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন মোদী।
অসুস্থ অটল বিহারী বাজপেয়ীর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণের পর দেয়া বক্তব্যে নরেন্দ্র মোদী বলেন, একটি কথা, হয়তো আমি আগে কখনো বলিনি। আজ বলতে পেরে আমি গর্ববোধ করছি। আমি রাজনীতিতে দেরিতে এসেছি, ১৯৯০’র এর দশকে। কিন্তু অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনসংঘ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে যে সত্যাগ্রহ করেছিল, একজন স্বেচ্ছাসেবক যুবকর্মী হিসেবে ওই সত্যগ্রহে যোগ দিতে আমি গ্রাম থেকে দিল্লি এসেছিলাম। বাজপেয়ী নিজে উপস্থিত হয়ে এই সম্মাননা নিতে পারলে আরো ভালো হতো। আমি আশা করি, অটল বিহারী বাজপেয়ী শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং সবাইকে নির্দেশনা দেবেন।
১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বরে ভারতীয় পার্লামেন্টে তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে অটল বিহারী বাজপেয়ীর দেয়া বক্তব্য তুলে ধরে মোদী বলেন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব বলতে কী বোঝায়, তা ওই বক্তব্যে বোঝা যায়। বাজপেয়ী বলেছিলেন, দেরিতে হলেও, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আমাদের সামনে ইতিহাস বদলের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়তি এই সংসদ এবং দেশকে এমন মহান কাজে রেখেছে, যেখানে আমরা শুধু মুক্তিসংগ্রামে জীবন দিচ্ছি না বরং ইতিহাসকে একটি পরিণতির দিকে নিতে চেষ্টা করছি। বাংলাদেশে নিজেদের সংগ্রামের জন্য লড়াই করা মানুষ এবং আমাদের রক্ত একসাথে বইছে। এই রক্ত এমন সম্পর্ক তৈরি করবে যা কোনোভাবে ভাঙবে না। কোনো ধরনের কূটনীতির শিকার হবে না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত ঝরেছে। ভারতের জনগণও তাদের পাশাপাশি লড়াই করেছে। তারা বাংলাদেশের স্বপ্নকে বুঝতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, আজ এই পবিত্র মুহূর্তে আমাদের এই সংকল্প করতে হবে যেন এ সম্পর্ক অটুট থাকে। বাজপেয়ীর সম্পর্কের বার্তা ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
নরেন্দ্র মোদী বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, যিনি নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা, তার হাত থেকে এ সম্মাননা নিচ্ছি। এটাই অনেক গৌরবের। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এবং বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে, তার মেয়ের উপস্থিতিতে এ সম্মান দেয়া হচ্ছে। মোদী বলেন, যুদ্ধে জয়ের গৌরব বাংলাদেশের মানুষের। ভারতীয়রাও চাইতো এ স্বপ্ন সত্যি হোক।
বাজপেয়ী বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু :শেখ হাসিনা
বঙ্গভবনের দরবার হলে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারতের রাজনৈতিক মহলকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে আনতে বাজপেয়ী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। অটলবিহারী বাজপেয়ীকে বাংলাদেশের একজন প্রকৃত বন্ধু একথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে আমি সম্মানিত বোধ করছি। বাজপেয়ীর উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে এ সম্মাননা হস্তান্তরে শেখ হাসিনা তাঁর আনন্দ ও সন্তোষের কথা প্রকাশ করে বলেন, ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে পাশে পেয়েছিল। ওই সময় ভারত বাংলাদেশী শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতিবিদ হিসেবে শ্রী বাজপেয়ীর অকুণ্ঠ সমর্থন ভারতীয় রাজনীতিকদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বাজপেয়ীর কাছ থেকে সব সময় সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি এ স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বলেন, বাজপেয়ী আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়ে এই সম্মাননা গ্রহণ করতে পারলে আমরা আরো খুশি হতাম। আমি কখনো সাফল্য বা ব্যর্থতায় উদ্বিগ্ন নই। দায়িত্ব পালনের পথে সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়কে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আমি, কেননা দু’টিই সত্য’- বিশিষ্ট কবি অটলবিহারী বাজপেয়ীর এই বক্তব্যের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বাজপেয়ীর দীর্ঘ জীবন ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেন। সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক, মন্ত্রিসভার সদস্য, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, তিন বাহিনীর প্রধানসহ সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সর্বোচ্চ সম্মান স্বাধীনতা সম্মাননা দেয়া হয় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। ২০১২ সালের ২৫ জুলাই ইন্দিরার পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধীর হাতে সেই সম্মাননাপত্র তুলে দেয়া হয়। আর ২০১৩ সালের ৫ মার্চ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে সম্মাননা জানানো হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বাজপেয়ী ভারতের লোসভার সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে অবদান রাখেন। ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা হিসেবে বাজপেয়ী ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৩ দিন দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ মেয়াদে তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত সরকার ১৯৯২ সালে তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ এবং ২০১৪ সালে ‘ভারতরত্ন’ পদকে ভূষিত করে।