বিমানের কেবিন ক্রু সৌরভের মৃত্যুর রহস্যের জট খোলেনি

আপনজনকে হারানোর শোকে কাতর পুরো পরিবার। কারও মুখে কোন কথা নেই। বাড়ি জুড়ে শুনশান নীরবতা। বিষক্রিয়ায় নিহত বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু নূর আলম আজাদ সৌরভের বাসার চিত্র এমনই। বগুড়া শহরের সেউজগাড়ীতে সৌরভের বাসায় গিয়ে এই চিত্র দেখা যায়।

 
বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী এলাকায় অবস্থিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিসের পাশ দিয়ে গলিপথ। কয়েকটি বাড়ি পেরুলেই আবার পূর্ব পাশে একটি গলিপথ। সেখানে একটি পুরাতন দ্বিতল ভবন। এটিকে সকলেই চেনেন আফজাল স্যারের বাড়ি বলেই। বগুড়ার শতবছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করোনেশন ইনস্টিটিউশনের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আফজাল হোসেন এখন বয়সের ভারে অনেকটাই কাহিল। তার সহধর্মিণীও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সেই কষ্ট তিনি সয়েছেন। কিন্তু অকালেই বিষক্রিয়ায় ছেলের মৃত্যুর সংবাদ তাকে নির্বাক করে দিয়েছে। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আদরের সন্তানকে হারিয়ে।
 
সৌরভের বাবাই শুধু নন শোকে কাতর তার স্ত্রী, ৯ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র কন্যা আফসিন। আর তার ৫ বছর বয়সী একমাত্র পুত্র সন্তান আদিব এখনও বুঝতেই পারেনি তার বাবা আর কোন দিনই ফিরবে না।
 
নূর আলম আজাদ ওরফে সৌরভের মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা এই জট এখনো খুলেনি। সৌরভের পরিবার এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছে। আর এই হত্যাকাণ্ডের জন্য রাজধানীর গুলশান পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহবুব ও সৌরভের কসমেটিকস দোকানের ৩ সাবেক কর্মচারী জড়িত বলে দাবি এই পরিবারের ।
 
এ ব্যাপারে সৌরভের ছোট ভাই মাসুম হোসেন জানান, বিমানে কেবিন ক্রুর চাকরির পাশাপাশি গুলশানের পিংক সিটিতে কসমেটিকসের দোকান দিয়েছিলেন সৌরভ। দোকানটি দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল রাজ্জাক, আল-আমিন ও আব্দুল্লাহ নামের ৩ কর্মচারী। মাঝে মাঝে ছোট ভাই পান্না দোকানে গিয়ে হিসাব নিতেন।
 
একমাস আগে দোকানের কর্মচারীদের মাধ্যমে সৌরভের সাথে পরিচয় হয় গুলশান ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাহবুব আলমের। অল্পদিনেই মাহবুব আলমের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও হয়। এরপর কর্মচারীদের ইন্ধনে ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে এসআই মাহবুবের সাথে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে যুক্ত হন। এরপরই এসআই মাহবুব আলম কর্মচারীদের বাদ দেয়ার কারণে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছেদ করতে চাইলে সৌরভ তাতে রাজি হয়। পরে এটা নিয়ে তাদের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়।
 
তিনি বলেন, টাকার জন্য এসআই মাহবুব আমার ভাই সৌরভকে হত্যা করেছে। তার উপযুক্ত বিচারের জন্য আমরা সব ধরনের আইনী লড়াই চালিয়ে যাব।
 
তবে এসআই মাহবুব এ প্রসঙ্গে বলেন, সৌরভ আমার কাছ থেকে ধার নিয়েছে। অনেকেই তার কাছে টাকা পায়। আমি তাকে মারবো কেন? তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। ঘটনার দিন সৌরভের আমার কাছে আসার কথা ছিল বলেও জানান তিনি।
 
গুলশান জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মোশতাক আহমেদ বলেন, উক্ত ঘটনায় যে জড়িত থাকবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল পর্যন্ত উক্ত ঘটনায় গুলশান থানায় মামলা হয়নি।
 
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে লাশের ময়না তদন্তের সময় চিকিত্সক মুখে বিষের গন্ধ পেয়েছেন। পাকস্থলিতেও বিষের গন্ধ পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়েছে। তবে বিষ খেয়ে থাকলে সেটা নিজে খেয়েছে নাকি অন্য কেউ খাবারের সঙ্গে খাওয়ালো কিনা সেটা তদন্ত সাপেক্ষে বের হয়ে আসবে। সৌরভের ভিসেরা পরীক্ষার জন্য মহাখালী রাসায়নিক পরীক্ষাগারে গতকাল প্রেরণ করা হয়েছে বলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়। গত বৃহস্পতিবার ৩টায় সৌরভ কিছুটা টাকা নিয়ে এসআই মাহবুবকে দেয়ার জন্য গুলশান আজাদ মসজিদের কাছে যাওয়ার কথা। তার ভাই জানান, এর আগে ঐদিন দুপুর ১২টায় সৌরভের মোবাইল ফোন থেকে তার ভাই মাসুমের মোবাইলে আাা ম্যাসেজ থেকে জানা যায় যে, সিলভার কালারের একটি নোহা মাইক্রোবাসযোগে তাকে অপরহরণ করা হয়। ঐদিন বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরী বিভাগে তার মৃতদেহ রেখে কয়েক ব্যক্তি পালিয়ে যায়। এ ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাহবাগ থানায় একটি জিডি করেছেন।
 

আমাদের বগুড়া প্রতিনিধি খোঁজ নিয়ে জানান, ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বগুড়ায় একটি অনুষ্ঠানে বিএনপি ভক্ত নূর আলম আজাদ বিএনপির তত্কালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব (বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের নজরে পড়েন। পরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। নূর আলম আজাদ হয়ে উঠেন তার অনেক বিশ্বস্ত কর্মী। হাওয়া ভবনে অবাধ যাতায়াতের সুযোগ মেলে। তারেক রহমানের আশীর্বাদে ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানের কেবিন ক্রু হিসেবে। এরপর থেকে তার নামের সাথে সৌরভ যোগ হয়। বিয়ে করেন। বিত্ত বৈভবে অল্প সময়েই অনেক বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন নূর আলম আজাদ সৌরভ। ওয়ান ইলেভেনে তারেক রহমান কারারুদ্ধ এবং পরবর্তীতে চিকিত্সার জন্য লন্ডন যাবার পর বিএনপি নেতাদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে এই সৌরভ কাজ করতেন বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।