লবণ অধ্যুষিত মংলা বন্দর শহরসহ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে বর্তমানে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চারিদিকে থৈ থৈ পানির মধ্যে মংলা পোর্ট পৌরসভার প্রায় ৬৪ হাজার লোক বাস করলেও কোথাও পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। অধিকাংশ লবণমিশ্রিত দূষিত পানি। মংলা পৌরসভার পক্ষ থেকে শহরবাসীর জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল ও লবণমিশ্রিত। ৫৪ লাখ লিটার পানির চাহিদা থাকলেও পৌরসভা সরবরাহ করে মাত্র ৫ লাখ লিটার পানি। এক কলস পানির জন্য ২/৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সকালে ও বিকালে সামান্য সময়ের জন্য পানি সরবরাহ করা হলেও এর কয়েকঘণ্টা আগে ভুক্তভোগীদের সিরিয়াল দিতে হয়। এক কলস পানির জন্য রীতিমত যুদ্ধ করা লাগে। এদিকে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাতেও বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন বয়সের মানুষ সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কলস, ড্রাম নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছুটাছুটি করছে। এসব এলাকার মানুষকে পুকুরের পানিই পান করতে হচ্ছে। কিন্তু মিঠাপানির পুকুরও এখানে খুবই কম। ফলে পানির জন্য নারীদের ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। অপরদিকে বিশুদ্ধ খাবার পানি না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে দূষিত লবণ পানি পান করছে। এতে করে শিশুসহ অনেক পৌরবাসীই প্রচণ্ড গরমে পেটের পীড়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
শহরতলির মাছমারা এলাকায় পৌরসভার একটি পানি শোধনাগার ও সরবরাহ প্রকল্প থাকলেও তা থেকে সরবরাহকৃত পানি দুর্গন্ধ ও লবণযুক্ত, কাদা ও ময়লা। উপজেলার চাঁদপাই, সোনাইলতলাসহ কয়েকটি ইউনিয়নে অগভীর নলকূপগুলোতে লোনা পানি ওঠে। এ কারণে এখানকার মানুষ বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে পুকুরের পানি খেয়ে থাকে। উপজেলার নির্দিষ্ট কয়েকটি পুকুর থেকে তারা পানির চাহিদা মেটাচ্ছে।
চাঁদপাই ও চিলা ইউনিয়নের ১০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ একটি পুকুরের ওপর নির্ভরশীল।
সোনাইলতলা ইউনিয়নের জয় খাঁ গ্রামের আবদুল কালাম বলেন, তাদের গ্রামের মিঠাপানির একমাত্র পুকুরের ওপর উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মানুষ নির্ভরশীল। চিলা গ্রামের অসীম মণ্ডল বলেন, ক্ষেত্রবিশেষে ১০-১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নারীদের এক কলস খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পাশের রামপাল উপজেলার একটি পুকুরের পানি ব্যবহার করছে চার গ্রামের মানুষ। আর কেউ কেউ রিকশা-ভ্যানওয়ালাদের কাছ থেকে ২৫ লিটারের এক পাত্র পানি ২০ টাকায় কিনছে।
মিঠেখালী গ্রামের আ. কাদের বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে পানির কষ্টে আছি। পাকিস্তান শাসন গেল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আমাদের পানির কষ্ট দূর হলো না।’ মংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) ডা. তরুণ কান্তি দাশ জানান, প্রায় প্রতিদিনই শিশুসহ বিভিন্ন রোগী পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সার জন্য হাসপাতালে এসে ভিড় জমাচ্ছেন। মংলা পৌরসভার মেয়র জুলফিকার আলী জানান, প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে পানি কিছুটা লবণ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি শুরু হলে এ সমস্যা আর থাকবে না।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের এই এলাকায় পুকুর খনন বা সংস্কারের জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উপজেলায় তিনটি মিঠাপানির পুকুর খনন করেছি। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।’ এছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর উপজেলাবাসীকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য কিছু পানির ট্যাংক দিয়েছে।