নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও আড়াইহাজার উপজেলার শতাধিক যুবক নিখোঁজ রয়েছে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নিখোঁজদের স্বজনরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আড়াইহাজার এবং ফতুল্লা থানায় নিখোঁজের ২০টি ও পাচারের ১০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ৩০ দালাল।
সর্বশেষ ফতুল্লায় গ্রেফতার হওয়া দালাল ইব্রাহিমের কাছ থেকে মানব পাচারের লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া গেছে। ইব্রাহিম জানায়, তিন হাত বদল করে থাইল্যান্ডের জঙ্গল পর্যন্ত পৌঁছে পাচার হওয়া হতভাগ্য লোকজন। এই ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার জঙ্গলের বন্দি শিবিরে আটক কাজলকে পাচার করে। কাজল হঠাত্ একদিন ফোন করে স্বজনদের বলে ইব্রাহিমকে টাকা দিতে। তাহলে তাকে ছেড়ে দেবে দালালরা। তবে ইব্রাহিমের স্বজনরা বিষয়টি পুলিশকে জানায়। ফতুল্লা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার সরফুদ্দিনের নেতৃত্বে কৌশলে ইব্রাহিমকে ডেমরা থেকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারকৃত ইব্রাহিম জানায়, প্রথমে চট্টগ্রামের জহিরের কাছে বিক্রি করা হয় কাজলকে। জহির বিক্রি করে মালয়েশিয়া প্রবাসী দালাল টেকনাফের জাকিরের স্ত্রীর কাছে। ইব্রাহিমের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী জহিরকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইব্রাহিম এবং জহিরের গ্রেফতারের পর কাজলকে বন্দি শিবির থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। পুলিশের চাপে পড়ে ইব্রাহিম এবং জহির দালালদের জানান তারা টাকা হাতে পেয়েছেন। এ সংবাদ পেয়ে জাকির জঙ্গলের বন্দি শিবির থেকে কাজলকে ছেড়ে দেয়। বর্তমানে কাজল থাইল্যান্ডের আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছেন।
মানব পাচারে টেকনাফের স্থানীয় প্রশাসন এবং বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পুলিশ দু-একজন দালালকে গ্রেফতার করলেও জড়িত প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা যায়, গত ১৫ মে আড়াইহাজার থানায় মানব পাচারের বিষয়ে পৃথক ৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এতে উল্লেখ করা হয়, আড়াইহাজার উপজেলার কল্যান্দী বালিয়াপাড়া গ্রামের জনি গত ১১ মার্চ আল-আমিন, সফর আলী ও সাজোয়ারকে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়াতে পাচার করে দেয়।
গত ২২ মে আড়াইহাজারের কামরাঙ্গীরচর দাসপাড়া এলাকার বাসিন্দা নাজমুল আহম্মেদ সুমনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে। এছাড়া সুমনের বিরুদ্ধে অন্তত ৩ কোটি টাকার চেক জালিয়াতির ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও চট্টগ্রামের আদালতে অন্তত ৯টি মামলা রয়েছে।
গত মার্চ মাসে আড়াইহাজার উপজেলার উচিত্পুরা ইউনিয়নের টেঘুরিয়াপাড়া গ্রামের ৫ যুবককে ট্রলারে করে মালয়েশিয়া পাচার করে দেয় দাবুরপুরা গ্রামের মানব পাচারকারী নাসু, জামাল, ছোট দাসিরদিয়া গ্রামের আরিফ, লতবদী গ্রামের আলামিন ও সাহাবুদ্দিন।
গত ২৪ এপ্রিল কাউসার ও আলাল তাদের পরিবারের কাছে ফোন করে জানায়, তারা অতি কষ্টে মালয়েশিয়া পৌঁছেছেন। তবে তাদের সঙ্গে যাওয়া সাদেক, কবির ও সেলিমকে তাদের সামনেই দালালরা ট্রলারের মধ্যে হত্যা করে সাগরে ফেলে দিয়েছে।
আড়াইহাজারের হোগলাকান্দি গ্রামের নিখোঁজ যুবক মাইনুদ্দিনের বোন রুনা জানান, তার ভাইকে কৌশলে মালয়েশিয়া পাঠায় হোগলাকান্দির মানব পাচারকারী কামাল, নৈকাহনের নাছু ও মঞ্জুর, বালুয়াকান্দির সিদ্দিক। মাইনুদ্দিনকে বাঁচাতে মানব পাচারকারীদের ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা দেয়া হলেও ৫ মাসে খোঁজ মেলেনি মাইনুদ্দিনের।
এদিকে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত বেশিরভাগই আড়াইহাজার থেকে গ্রেফতার হয়েছেন। শুধুমাত্র ২ জনকে ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি আড়াইহাজারে বিশনন্দী ইউনিয়নের দড়িবিশনন্দী গ্রামের আব্দুল আলীম ও ফতেপুর ইউনিয়নের দাবুরপুরা এলাকার রফিকুল, ৫ ফেব্রুয়ারি ফতেহপুর ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া এলাকার আব্বাস আলী, ৩ ফেব্রুয়ারি ফতেহপুর ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের মোবারক, ৩১ জানুয়ারি ফতেপুর ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামের উপজেলা রিকশা শ্রমিক লীগের সভাপতি আবুল বাছেদ ওরফে লেংড়া বাছেদ, ২৮ জানুয়ারি ফতেপুর ইউনিয়নের লতবদী গ্রামের হক মিয়া ও আতাউর রহমান, ১ জানুয়ারি ফতেপুর ইউনিয়নের মাছুম ও আমানউল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় দীর্ঘ ৫ বছর ধরে মাঠপর্যায়ে কর্মরত অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, আড়াইহাজার উপজেলাতে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল অনেক দালাল। যার মধ্যে ফতেপুর, বিশনন্দী, হাইজাদী ইউনিয়নে দালালদের সংখ্যা বেশি।
আড়াইহাজার থানার ওসি মোহাম্মদ আলমগীর জানান, গত ৭-৮ মাসে মানব পাচারের ঘটনায় ৯-১০টি মামলা হয়েছে। ওই সকল মামলার আসামিদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে পাচারের শিকার পরিবারগুলো সাধারণত কোন মামলা করে না বিধায় আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি না।
আড়াইহাজার উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ সামছুল হক জানান, মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সভা সমাবেশ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে যথেষ্ট সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া দালাল চক্রের বিষয়েও খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। তাদেরকে ধরতে পারলে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মুহিদ উদ্দিন জানান, পাচারকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে একাধিক মামলাও গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি পাচারকারীদের প্রকৃত পরিচয় ও যেসব পরিবার হতে পাচার হয়েছে তাদেরকে আইনের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেন, পুলিশ সর্বতোভাবে সহায়তা করতে প্রস্তুত।