তিন দফা বিক্রির পর উধাও আব্দুর রহিম

দালালদের কাছে তিনদফা বিক্রির পর এখন উধাও হয়ে গেছে মানব পাচারের শিকার আব্দুর রহিম খোকন। সহজ-সরল রহিমকে মালয়েশিয়ায় ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে দালালচক্র। পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে ওই চক্র তাকে ফুসলিয়ে সমুদ্রপথের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ঠেলে দেয়। রহিম নিখোঁজ হওয়ার পাঁচদিন পর কক্সবাজারের মানব পাচারের মাফিয়া সাদেক আলী হাজী হঠাত্ ফোন (বড় ভগ্নিপতি) করে রহিমের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার তথ্য দিয়ে টাকা দাবি করেন। রহিমের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত না হয়ে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান তার পরিবারের সদস্যরা। এরপর দালাল সাদেক আলী হাজী ও রহিমের আরেক ভগ্নিপতির (সেনাসদস্য) কয়েকদফা ফোনালাপে উঠে এসেছে তাকে তিন দফা বিক্রির চাঞ্চল্যকর তথ্য। পাশাপাশি কক্সবাজারের মানব পাচারকারীদের ছোট ছোট বন্দীশালার তথ্যও পাওয়া গেছে।

 
২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার (মুরারীকাঠি) গুপীনাথপুরের মৃত ফারুক হোসেনের একমাত্র পুত্র আব্দুর রহিম দালালের ফাঁদে পড়ে বাড়ি ছাড়েন। হঠাত্ করে ১২ জানুয়ারি উখিয়ার ননিয়াচরের সাদেক আলী হাজী মোবাইল ফোন (০১৭৭৮-৭০৭৪১৬) থেকে রহিমের ভগ্নীপতি সিদ্দিককে জানান, রহিমকে পানিপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য রহিমের ছোট ভগ্নিপতি (সেনা সদস্য) সাদেক আলীকে ফোন দেন। রেকর্ডকৃত ফোনালাপে সাদেক আলী হাজী জানিয়েছিলেন, আব্দুর রহিম খোকনকে তার কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তিনি তিন নম্বর ক্রেতা। ঢাকার দালালের মাধ্যমে তিনি গ্রামের যুবকদের কিনে থাকেন। এর আগে যারা রহিমকে গ্রাম থেকে নিয়ে এসেছিল, তারাই ঢাকায় দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়। এরপর ঢাকার দালালের কাছ থেকে আব্দুর রহিমকে তিনি কিনে নেন। সাদেক আলী হাজী জানান, রহিম বর্তমানে ইয়াঙ্গুনে আছে। প্রথম কক্সবাজার থেকে ছোট নৌকায় করে তাকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। ওই নৌকায় আমার দু’ছেলেও আছে। কিন্তু কিছু সমস্যা হওয়ায় ১৪দিন যাবত্ নৌকাটি ইয়াঙ্গুনে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে বর্তমানে থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়েছে। আজকালের মধ্যে রহিম আপনাদের সঙ্গে কথা বলবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় টাকা আপনারা পাঠিয়ে দেবেন। সাদেক আলী আরো জানান, রহিমের কাছে যে নম্বর আছে (বড় ভগ্নিপতি সিদ্দিক) সেই নম্বরে ফোন দিয়ে আপনাদের জানিয়ে দেয়া হবে। কে বা কারা কত টাকায় তাকে বিক্রি করেছে-সে বিষয়ে জানতে চাইলে সাদেক আলী তাদেরকে ওই বিষয়ে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
 
এভাবে সপ্তাহ পার হলেও আব্দুর রহিমের সর্বশেষ অবস্থা জানাননি সাদেক আলী। ২০১৪ সালের জানুয়ারির শেষদিকে তিনি শুধু বলেছেন, যে নৌকায় করে রহিম, ইউসুফ, আজম, কলিমুল্লাহ, শাহিনসহ অন্যদের পাঠানো হয়েছে তাদের সম্পর্কে কিছু জানতে পারছি না। তবে ওই নৌকার যাত্রীদের থাইল্যান্ড পুলিশ ও দস্যুরা আটক করেছে বলে তিনি রহিমের পরিবারের সদস্যদের জানান। এরপর থেকে যতবারই সাদেক আলীকে ফোন দেন, ততবারই তার নম্বর বন্ধ পান রহিমের পরিবারের সদস্যরা। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন কারাগারে ব্যাংককস্থ দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ নিয়েও রহিমের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
 
পরিবারের একমাত্র সদস্য তার মা রাহিলা খাতুন সন্তানের সন্ধানে পাগলপ্রায়। এখানে ওখানে ছুটাছুটি করে সন্তানকে না পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তিনি। রহিমের পাঁচ বোন ও ভগ্নিপতিরাও অবিবাহিত রহিমের সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, অর্থ-সম্পদের অভাব নেই। একমাত্র ভাই এভাবে বিদেশ যেতে পারে না। সম্পদের লোভে তাকে জোরপূর্বক বিদেশ পাঠানোর নামে অপহরণ করা হয়েছে।
 
কক্সবাজারেও আছে বন্দীশালা
 

কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় মানব পাচারের শিকার হওয়াদের নিয়ে ছোট ছোট বন্দীশালা ছিল দালালদের। পানিপথে বিদেশ পাঠানোর আগে আব্দুর রহিম খোকনও বন্দীশালায় আটক ছিল। সাতক্ষীরার কলারোয়ার ঝিকরার গোলাম রসুলের পুত্র রনি ও রহিম সমুদ্রের ছোট নৌকায় ওঠার আগে সাদেকের বন্দীশালায় ছিল। রনি সাদেকের সহায়তায় সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যেতে থাইল্যান্ডের পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। রনির কোন খোঁজ না পেয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে তার বড় ভাই বাবলু সাদেকের দ্বারস্থ হন। কক্সবাজারের উখিয়ায় গিয়ে ভাইয়ের উদ্ধারে সাদেককে ৫৫ হাজার টাকা দেন বাবলু। টানা ১২ দিন সেখানে অবস্থানের পরও ভাইয়ের কোন সন্ধান দিতে পারেনি সাদেক। পরে সাদেক বাবলুকেই বিক্রি করে দেয়। এ বিষয়ে বাবলু ইত্তেফাককে জানান, আমাকে বিক্রি করা হয়েছে-এ বিষয়ে জানার পর একজন শিক্ষকের সহায়তায় সাদেকের বন্দীশালা থেকে পালিয়ে আসি। রনি কিংবা রহিম কেউ পরিবারকে না জানিয়ে সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়ার পথে পা বাড়ায়। পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় থাইল্যান্ডের কারাগার থেকে ভাই রনিকে দেশে ফেরত আনেন বাবলু। এদিকে রহিমকেও উদ্ধারের জন্য আবার বাবলুর কাছে ১৮ হাজার টাকা দেন রহিমের ভগ্নিপতিরা। কিন্তু বাবলু ও তার ভাই এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেয়নি বলে জানান রহিমের পরিবারের সদস্যরা। রনি কার সহায়তায় সমুদ্রপথে থাইল্যান্ডে গিয়েছিল সে-বিষয়ে তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শুধু রহিম বা রনি নয়, এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যুবকদের ফুসলিয়ে কক্সবাজারের পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয় দালাল চক্র।