‘জলের জন্য আমাদের কষ্টের শ্যাষ নাই। আমাদের মহলদার বাড়ির পুকুরটি ছিল ১৫-২০ গ্রামের মানুষের ভরসা। আইলার পর একটি এনজিও পুকুরটি পুনঃখনন কইরে সর্বনাশ কইরছে। তারা কিছু মাটিও কাটছে। কিন্তু জল আর আগের মতো মিষ্টি নাই। তারপরও দায় ঠেকে খাচ্ছি, ব্যবহার করছি। এই জল না খাইলে আমরা জল পাব কোহানে।’ উপকূলীয় বাগেরহাট জেলার মংলা উপজেলার দ্বিগরাজ গ্রামের প্রতিভা মহলদার ও ইরা মহলদারসহ কয়েকজন গৃহবধূ আক্ষেপ করে তাদের এই কষ্টের কথা বলছিলেন।
দ্বিগরাজ গ্রামের মহলদার বাড়ির পুকুরের মিষ্টি পানির সুনাম অনেক দিনের। কেউ বলেন একশ বছর, কেউ আরো বেশি। হাজারো মানুষের চাহিদা মিটানো এ মিষ্টি পানির আধার শেষ হয়েছে মাত্র ৩/৪ বছর আগে। একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে পুকুরটি ‘সংস্কার’ ও পুনঃখননে এখন অনেকটাই মৃত মহলদার বাড়ির পুকুর। শুধু মহলদারদের পুকুরই নয়, খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় বিভিন্ন উপজেলার অধিকাংশ সরকারি পুকুরের চিত্রই এমন। আবার কোন কোনটি স্থানীয় প্রশাসক প্রভাবশালীদের ইজারা দেয়ায় পানির চাহিদা মিটাতে পারছে না সাধারণ মানুষ। এখন তাদের একমাত্র ভরসা বৃষ্টির পানি। আর তা না হলে ৩০-৪০ টাকার বিনিময়ে কিনতে হয় এক পট (৩০ লিটারের পাত্র) পানি। সম্প্রতি মংলাসহ আশপাশের উপকূলীয় এলাকার সরেজমিনে এসব তথ্য জানা গেছে।
মহলদার বাড়ির গৃহকর্তা ৮৩ বছরের বৃদ্ধ সতীশ মহলদার আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা তো মানুষ নই। এই চারিপাশে জল দেখছেন, আমরা জলের মধ্যেই বাস করছি আর প্রতিদিন বিষ খাচ্ছি। বাপ-দাদায় জলের জন্য পুকুর কাইটে গেছে– তাও একশ বছর পার হইছে। আশপাশের গ্রামের কয়েক হাজার লোক এই পুকুর থেকেই জল নিত। কিন্তু তাও শ্যাষ! ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কি করবো, ওই দিয়াই চলতি হইচ্ছে। আমরা জলের মধ্যে থাইক্যাও জলের কষ্টে আছি।’ মত্স্য ব্যবসায়ী খোনকারবেড় গ্রামের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘চিংড়ি চাষের জন্য মংলাসহ উপকূলীয় এলাকার বিঘার পর বিঘা জমিতে সারা বছরই নোনাপানি ধরা রাখা হয়। চারপাশে নোনাপানি রেখে মিষ্টি পানির পুকুর বাঁচানো যাচ্ছে না। সরকার পুকুর সংস্কারের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও তা কাজে আসে না।’
খুলনার দাকোপ উপজেলার পানি অধিকার কমিটির নেতা গৌরাঙ্গ প্রসাদ রায় বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন মিষ্টি পানির আধার খাল-পুকুর ও জলাশয় ইজারা না দেয়ার জন্য আন্দোলন করছি। কিন্তু কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। কতিপয় লোক লাভবান হলেও গোটা উপকূলের বাসিন্দাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাও পানির জন্য হাহাকার করছে।’
এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেল্থ-এর অ্যাডভোকেসি ও তথ্য কর্মকর্তা যোসেফ হালদার বলেন, ‘উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের চমত্কার একটি নীতিমালা রয়েছে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি মিষ্টি পানির পুকুর থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। বরং বেসরকারি উদ্যোগের পুকুরগুলো নানা প্রকল্পের মাধ্যমে নষ্ট করা হচ্ছে।’
উদাহরণ দিয়ে যোসেফ হালদার বলেন, মংলার বুড়বুড়িয়ার পুকুর, বাছাড়ের পুকুর, মহলদারের পুকুর, উত্তর বাঁশতলা পুকুরসহ পানির উত্স আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। গত ২৫ মে খুলনা জেলা প্রশাসন সম্মেলন কক্ষে এনজিও ফোরাম ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে ‘পানি-অধিকার: দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বাস্তবতায় আমাদের করণীয়’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, এই অঞ্চলে নিরাপদ পানির সাথে পরিবেশও বিপন্ন হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে এই অঞ্চলের পরিবেশ ও মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হবে। সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি ‘সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’কে জনপ্রিয়করণ ও অবকাঠামো নির্মাণের উপর জোর দিতে হবে।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মোঃ আব্দুস সামাদ খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মিষ্টি পানির আধার হিসেবে পরিচিত সরকারি পুকুর ও জলাশয় ইজারা না দেয়ার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, যেসব জলাধার ইজারা দেয়া হয়েছে তালিকা পেলে জনস্বার্থে তা বাতিল করা হবে। খাস জমিতে পুকুর বা দীঘি খনন করা যেতে পারে, যেগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে।