খুনে সাকিব ও সুন্দর জুবায়ের

পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের পরই ব্যথাটা আবার ফিরে এসেছে।

 
চিকিত্সকের মতামত ছিলো, এ অবস্থায় অস্ত্রোপচার থেকে রেহাই পাওয়ার একটাই উপায়—টানা বিশ্রাম। সেটাও না পারলে বোলিংটা অন্তত করা চলবে না। কিন্তু সাকিব আল হাসানকে বিশ্রাম দেয়া বা বোলিং থেকে রেহাই দেয়ার মতো ‘বিলাসিতা’ করার যে উপায় বাংলাদেশের নেই। গতকালও ফতুল্লায় বুঝিয়ে দিলেন, ব্যথা-অস্ত্রোপচারের হুমকি মাথায় নিয়েও তিনিই সেরা।
 
দিনটাকে সাকিবের দিন বলা যেতো। মুরালি বিজয়, আজিঙ্কা রাহানেও দিনটাকে তাদের বদলে দাবি করতে পারেন। এমনকি দিনের সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলো উপহার দেয়া লেগস্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখনের দিন বললেও অন্যায় নেই। তবে শেষ বিচারে গতকাল ফতুল্লা টেস্টের তৃতীয় দিনটা শুধুই বৃষ্টির নাটকীয়তার।
 
লাঞ্চের সময় থেকে শুরু হয়ে মিনিট কয়েক বাদেই বৃষ্টি এলো, কাভার এসে মাঠ ঢেকে দিলো, আবার একটু রোদের দেখা মিললো, একটু ক্রিকেট হলো; এভাবে ছেলেখেলায় এগোলো দিন। আর এর মধ্যে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের দ্রুত রান তোলার চেষ্টার বিপরীতে নায়কোচিতভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন সাকিব ও লিখন।
 
এর মধ্যে সাকিবের নেয়া প্রথম উইকেটটাই ছিলো তার জন্য ঐতিহাসিক এক কীর্তি।
 
ধাওয়ানের উইকেটটি ছিল দেশের মাটিতে তার শততম টেস্ট উইকেট! দেশের মাটিতে ১০০ টেস্ট উইকেট নেয়া বাংলাদেশের প্রথম বোলারও সাকিব। ভারতের ২৮৩ রানের পর্বতসমান উদ্বোধনী জুটি ভেঙে এই মাইলফলক স্পর্শ করলেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার।
 
শিখর ধাওয়ান তখন ডাবল সেঞ্চুরি দেখতে পাচ্ছিলেন। সেই সময়েই সেট এই ব্যাটসম্যানকে ডাউন দ্য উইকেট আসতে দেখে একটু খাটো লেন্থে বল করে নিজের হাতেই ক্যাচ দিতে বাধ্য করলেন সাকিব। ধাওয়ান যাওয়ার পরও এক প্রান্তে মুরালি বিজয় লড়াই চালিয়ে গেছেন, সেঞ্চুরি পেয়েছেন। তবে অন্য প্রান্তে শিকার শুরু করে দিয়েছিলেন সাকিব ও লিখন। নিজের পরের ওভারেই রোহিত শর্মাকে বোল্ড করে ফেরান। আর এর পরই বিরাট কোহলির মতো ব্যাটসম্যান লিখনের গুগলিতে চরম বিভ্রান্ত হয়ে ব্যাটে, প্যাডে বল লাগিয়ে বোল্ড হলেন; লিখন এই ডেলিভারি নিয়ে গর্ব করতে পারেন।
 
চতুর্থ উইকেটে অবশ্য মুরালি বিজয় ও রাহানে আবার শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। দু’ জনকেই ফিরিয়ে বাংলাদেশকে আবার খেলায় ফেরান সাকিব। আর দর্শনীয় আরেক গুগলিতে হূদ্ধিমান সাহাকে ফেরান জুবায়ের।
 
সাকিবের টেস্ট অভিষেক দেশের মাটিতেই, ২০০৭ সালে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামে। তবে প্রথম ৩ টেস্টে উইকেটের দেখা পাননি। ২০০৮ সালে ওয়েলিংটনে নিউ জিল্যান্ডের ওপেনার ক্রেইগ কামিংকে আউট করে পেয়েছিলেন প্রথম উইকেটের দেখা। দেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট উইকেট ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ টেস্টে, আর্ম ডেলিভারিতে বোল্ড করেছিলেন এবি ডি ভিলিয়ার্সকে। সেই সাকিব দেশের মাটিতে ২৮তম টেস্টে করে ফেললেন উইকেটের সেঞ্চুরি!
 
উইকেটটি ছিল দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে সাকিবের ১৪৩তম টেস্ট উইকেটে। দেশের বাইরেও বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট উইকেট সাকিবের, ১২ টেস্টে ৪৩টি।
 
বাংলাদেশের হয়ে একশ’ টেস্ট উইকেট আছেই আর কেবল মোহাম্মদ রফিকের। দেশের বাইরে ১৫ টেস্টে ৩৪ উইকেট রফিকের।
 
সে তুলনায় জুবায়ের হোসেন লিখনের কীর্তিটা মোটেও বিরাট কিছু নয়।
 
১১৩ রান দিয়ে এ পর্যন্ত ২টি ‘মাত্র’ উইকেট নিয়েছেন; এটা বড় কীর্তি বলে মনে হওয়ার কারণই নেই। কিন্তু ওই যে, পরিসংখ্যানকে ‘মূর্খ’ বলা হয় এ কারণেই। সারা দিনে দু’ দল মিলিয়েই নিশ্চয়ই সেরা ক্রিকেটার ছিলেন এই লিখন। যে ১৯ ওভার বল করলেন, তার বেশিরভাগ ডেলিভারিই দীর্ঘদিন মনে রাখার দাবি জানিয়ে গেলো। কথায় কথায় গুগলি দিয়ে চরম বিভ্রান্ত করলেন স্পিনে অসাধারণ বলে খ্যাত ভারতীয়দের। বিরাট কোহলি, আজিঙ্কা রাহানের মতো ব্যাটসম্যান থতোমতো খেয়ে তাকিয়ে রইলেন বারবার জুবায়েরের গুগলিতে।
 
বিরাট কোহলি আর হূদ্ধিমানকে যে দুটো গুগলিতে ফিরিয়েছেন, তা বাঁধিয়ে রাখার মতো বৈকী! এর বাইরে দফায় দফায় পরাস্ত করেছেন ব্যাটসম্যানদের। শেষ পর্যন্ত খেলা বন্ধ হওয়ার খানিক আগে যে গুগলি পড়তে না পেরে হরভজন প্রাণ হারাতে হারাতে বাঁচলেও; সেটাও বিজ্ঞাপনে ঠাঁই পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।
 
শুধু গুগলিটাই একমাত্র হাতিয়ার হলে কথা ছিলো। একের পর এক ক্ল্যাসিক বাঁক দিয়েও কাবু করলেন ব্যাটসম্যানদের। স্রেফ দুর্ভাগ্য বলে, উইকেট সংখ্যা অনেক বেশি হয়নি। অন্তত এদিনটায় তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে ওই দুই উইকেট নিয়েই। তবে লিখন আশ্বস্ত থাকতে পারেন, প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা অন্তত তার বোলিং সহজে ভুলবেন না।
 
 স্কোরকার্ড
 
ভারত ১ম ইনিংস
 
                                              রান    বল     ৪     ৬
 
মুরালি বিজয় এলবিডব্লিউ ব সাকিব ১৫০  ২৭২   ১২   ১
 
শিখর ধাওয়ান এলবিডব্লিউ ব সাকিব        ১৭৩   ১৯৫ ২৩    ০
 
রোহিত শর্মা ব সাকিব                  ৬       ৯        ১     ০
 
বিরাট কোহলি ব জুবায়ের             ১৪     ২২      ২     ০
 
অজিঙ্কা রাহানে ব সাকিব              ৯৮     ১০৩   ১৪   ০
 
ঋদ্বিমান সাহা ব জুবায়ের              ৬       ১০     ১     ০
 
রবিচন্দন অশ্বিন অপরাজিত           ২       ৩       ০     ০
 
হরভজন সিং অপরাজিত               ৭       ৮       ১     ০
 
অতিরিক্ত (বাই ৪, লেগবাই ১, নোবল ১) ৬
 
মোট (৬ উইকেটে, ১০৩.৩ ওভার)        ৪৬২
 
উইকেট পতন: ১-২৮৩ (ধাওয়ান, ৬৭.৫), ২-২৯১ (রোহিত, ৬৯.৫), ৩-৩১০ ( কোহলি, ৭৪.৬), ৪-৪২৪ (মুরালি বিজয়, ৯৭.৪), ৫-৪৪৫ (ঋদ্বিমান সাহা, ১০০.৬), ৬-৪৫৩ (রাহানে, ১০১.৪)
 
বোলিং: মোহাম্মদ শহিদ ২২-২-৮৮-০, সৌম্য সরকার ৩-০-১১-০, শুভাগত হোম চৌধুরী ১৪-০-৫২-০, সাকিব আল হাসান ২৪.৩-১-১০৫-৪, তাইজুল ইসলাম ২০-০-৮৫-০, জুবায়ের হোসেন লিখন ১৯-১-১১৩-২, ইমরুল কায়েস ১-০-৩-০।
 

টস জয়: ভারত