কেমন হলো বাজেট

আগামী অর্থবছরের (২০১৫-১৬) জন্য অর্থমন্ত্রী আবদুল মুহিত ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি বিবেচনায় বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বড় ব্যয়ের বাজেট প্রয়োজনীয়। সুতরাং বাজেট বড় হওয়াটা আকাঙ্ক্ষিত। তবে আকাঙ্ক্ষিত বড় বাজেট বাস্তবায়নই হল মূল চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। ফলে শঙ্কাটা আরও বাড়ছে। বাজেটের ব্যয় (উন্নয়ন) দক্ষভাবে সম্পন্ন করা নিয়েও রয়েছে সংশয়। এদিকে ভৌত অবকাঠামো খাতে বড় ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ (অংশের বিচারে) কমানো হয়েছে। এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল কেমন হবে তা-ও ভাবা উচিত।
 
বাজেটের আয়ের দিকে এনবিআর থেকে আয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এ বিশাল আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআরের পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখনও হয়নি। লোকবলের ঘাটতি রয়েছে, ডিজিটালাইজেশনের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। ফলে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতিই তার প্রমাণ। এবারের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ বড় অংঙ্কের অর্থ দক্ষভাবে ব্যয় করা নিয়েও রয়েছে সংশয়। যদি অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিক থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নের হার না বাড়ে তবে বছরের শেষ দিকে অদক্ষভাবে ব্যয় করা প্রকল্প প্রকৃত উন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখতে পারে। তাই বছরের শুরু থেকেই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে নজর দিতে হবে। তাছাড়া এডিপি ব্যয়ের দক্ষ ব্যয়ও তদারকির মধ্যে রাখতে হবে।
 
এবারের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। তবে রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হলে ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বাড়তে পারে। যা বেসরকারি বিনিয়োগে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি করবে। অবশ্য, রাজস্ব ব্যয় যা প্রাক্কলন করা হয়েছে তা ঠিকভাবে করা সম্ভব না হলে ঘাটতি বাড়বে না। বরং কমতে পারে। আমাদের সাম্প্রতিক প্রবণতা অনেকটাই সেরকম। এদিকে বৈদেশিক সহায়তা থেকে আয় ধরা হয়েছে ৮.২ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি মেটাতে হলে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সহায়তা ব্যবহার করতে হবে। যেখানে এর আগে কখনোই তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি সহায়তা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নেই। বৈদেশিক সহায়তা ঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের উপর নির্ভরতা বাড়বে। যা আবার ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরি করতে পারে।
 
আগামী অর্থবছরে (২০১৫-১৬) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিনিয়োগ ঠিকভাবে হলে প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি কতটা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৬.২ শতাংশ। এক্ষেত্রে দুটো জিনিস থাকতে হবে। একটি হচ্ছে কঠোর বাজার তদারকি, অন্যটি হচ্ছে রাজনৈতিক বিশৃংখলা যেন না থাকে। তবে ঘাটতি বেশি বাড়লে মূল্যস্ফীতির এ হার ঠিক নাও থাকতে পারে।
 
এবারের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ধরনের ভাতার ওপর যে করারোপ করা হয়েছে সেটি অত্যন্ত যথাযথ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণের জন্য কর রেয়াত আগের মতো বহাল থাকবে, এটা ভালো সিদ্ধান্ত। সিগারেটের ওপর কর বৃদ্ধি করাটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। এর বাইরে যেসব বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অতিরিক্ত মাসিক আয় করেন তাদের ওপর কর বাড়ানো পাশাপাশি ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক, হাসপাতাল ভেদে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অস্ত্রোপচার বাবদ অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফি আদায় দূর করার জন্য পরীক্ষামূলকভাবে কর  বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এদিকে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে টেকসই অবস্থান পেতে হলে অবশ্যই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মানসম্পন্ন উন্নয়ন দরকার। তাই প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয়টি আরও বাড়ানো উচিত।  অথচ ঘোষিত বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শিক্ষাখাতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের হার ধীরে ধীরে কমছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বরাদ্দকৃত অর্থ যথেষ্ট নয়, অপূর্ণ থেকে যাবে শিক্ষকদের বহু চাহিদা। পুরো শিক্ষাখাতকে যেভাবে সরকার খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেটাও বিঘ্নিত হবে। কারণ কম্পিউটার প্রযুক্তির সহায়তা বাড়ানো এবং এ সেবার পরিধি বাড়াতে হলে দেশজুড়ে অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। উন্নত দেশগুলো যেখানে শিক্ষা খাতে প্রতিনিয়ত বরাদ্দ বাড়িয়ে চলেছে। আমরাই শুধু ব্যতিক্রম। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ ধরা হয়েছে, মোট ব্যয়ের ৪.৩ শতাংশ। স্বাস্থ্যখাতের এ ব্যয় যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। তবে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়লে দুদিক থেকে লাভ আছে। একটি হচ্ছে- দেশ থেকে মোটা অংকের টাকা বিদেশে বৈধ-অবৈধ পথে চলে যায় চিকিত্সা সেবার জন্য। আমাদের দেশে যদি মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে যেতো না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিদেশ থেকে আমাদের দেশে মেডিক্যাল ট্যুরিজমের আওতায় বহু লোক আসতো এবং আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হতাম, যেভাবে ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড চিকিত্সা সেবা দান করে লাভবান হচ্ছে।
 
বাজেট নিয়ে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন এবারের বাজেটে বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন। বিশেষ করে রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে সেটি আদায় কঠিন। আবার উন্নয়ন ব্যয়ের যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত তাও বাস্তবায়ন হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত এডিপির মাত্র ৫৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। শেষে অবশ্য দেখা যাবে বাস্তবায়ন অনেক বেড়েছে। তবে সেখানে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি বলেন, বাজেট দেয়ার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। প্রথমত, যথার্থভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব করা। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। এটি করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগও আসবে। তৃতীয়ত, সামাজিক খাত, বিশেষ করে- কর্মসংস্থানমূলক কারিগরি শিক্ষা, সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা দরকার।
 

অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেছেন, বাজেটের যে আকার তা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। তবে বাস্তবায়নই হলো মূল কথা। বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। আর এডিপি বাস্তবায়নে ১ জুন থেকেই অর্থ ছাড় করা দরকার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি আদায় সম্ভব। তবে মূল্যস্ফীতির যে হার ধরা হয়েছে তা ঠিক রাখা চ্যালেঞ্জিং। যেহেতু সরকারি বেতন বাড়ানো হবে। এর প্রভাবে বেসরকারি বেতনও বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে দেশের মূল্যস্তরে। খাত ভিত্তিক পর্যালোচনায় তিনি বলেন, শিক্ষা খাত ও প্রযুক্তি খাতে পৃথকভাবে বরাদ্দ দিলে ভাল হতো। আর স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা তুলনামূলক কম।