জার্মানিতেও দারিদ্র্য সমস্যা!

বোকারাও অনুভব করতে পারে জার্মানির সমৃদ্ধি। দেশজুড়ে হাই-রাইজ হোটেল, শপিংমল ও বিলাসবহুল বাড়ির আধিক্য দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং হার্টল্যান্ড দক্ষিণ-পশ্চিমে পা রাখলে মনে হয়, এ এক অন্য দুনিয়া। ইউরোপ মহাদেশের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন এখন জার্মানি। বাধা কাটিয়ে জার্মানরা আবার খোলা মনে তাদের ওয়ালেট খুলতে শুরু করেছে। ভোক্তা আস্থা ১৩ বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ। গ্রীস ও ইতালি যেখানে ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়েছে, সে জায়গায় ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির চলতি হিসাব উদ্বৃত্তে গড়েছে নতুন রেকর্ড। তাদের রপ্তানি শিল্প অনেক আগেই বনে গেছে বিশ্বের সর্ববৃহত্। বিশ্বমন্দার এই সময়েও প্রত্যাশার চেয়ে বেশি রপ্তানি করছে তারা। এই অর্থনৈতিক সাফল্য বৈশ্বিক স্তরে জার্মানিকে এনে দিয়েছে ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা। ইউক্রেন ও সিরিয়া ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় তারাই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বার্লিন। এই মুহূর্তে অভিবাসীদের কাছে দ্বিতীয় জনপ্রিয় জায়গা এই দেশটি। প্রথম স্থানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

 
উপরে বর্ণনা করা হয়েছে সাফল্যের কাহিনী। এ দিকটা চোখ-কান খোলা সবারই জানা। কিন্তু ভিন্ন জার্মানির গল্প খুব কম জনই জানে। জার্মানির টেম্পেলহফ অঞ্চলে একটি কল্যাণ কেন্দ্রে কল্যাণ ভাতার জন্য নাম নিবদ্ধ করতে ইনফরমেশান ডেস্কের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্রিস্টিন স্মেলজেল। কোলে ছিল দুই মাস বয়সী ঘুমন্ত শিশু। লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা ভারি হয়ে আসছিল; কিন্তু কেউই তাকে আগে নাম নিবদ্ধ করার জন্য ছাড় দিতে রাজি হচ্ছিল না। ২৫ বছর বয়স্ক একক মা ক্রিস্টিন পেশায় হেয়ারড্রেসার। জার্মানিতে এ পেশার লোকজন এমনিতেই কম বেতন পায়। ছেলে জন্মানোর আগে পুরো দিন কাজ করেও নিজের সব চাহিদা মিটাতে পারতেন না। সেজন্য সপ্তাহান্তে বাড়তি কাজ করতেন। এখন বাধ্য হয়েই খণ্ডকালীন চাকরি করতে হচ্ছে। আর তারই ফল ভোগ করতে হচ্ছে; লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে কল্যাণভাতার জন্য। ক্রিস্টিন আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘কঠিন, খণ্ডকালীন হেয়ারড্রেসারের কাজ করে একা চলাটাই খুব কঠিন। সন্তান নিয়ে চলার তো প্রশ্নই উঠে না। অপারগ হয়েই আমাকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে।’
 
জার্মানি এক উদ্ভট পরিস্থিতির মুখোমুখি। বেকারত্ব কমছে; দেশ আরো সমৃদ্ধ হচ্ছে, কিন্তু সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্য ও অসমতা। ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়ে বিতর্কও হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি। বার্লিন-ভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় কল্যাণ সংস্থা পারিটাটিশে গেসামটভারবান্ড তাদের এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ২৫ বছর আগে জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর থেকে দারিদ্র্য রয়েছে সর্বোচ্চ স্তরে। জার্মানির ৮০ মিলিয়ন লোকের ১২.৫ মিলিয়ন লোককেই দরিদ্র হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা যায়। এদের আয় প্রতি খানার গড় আয়ের চেয়ে অন্তত ৬০ শতাংশ কম। সেখানে গড়ে প্রতি খানার মাসিক আয় ৯০০ ইউরোর কাছাকাছি।
 
জার্মানিতে কর্মজীবী দরিদ্র লোকের সংখ্যা বাড়ছে। সে দেশের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অফিসের তথ্যানুসারে, ৩০ লাখেরও বেশি জার্মান শ্রমিক দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছে। শ্রমিকদের সুরক্ষিত রাখতে কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এমন লোকের সংখ্যাকে কমানো যাচ্ছে না।
 
পারিটাটিশে গেসামটভারবান্ড ক্রমাগতই চাকরি পাওয়া লোকের সংখ্যা বাড়ছে জার্মানিতে। কিন্তু সেই চাকরি দিয়ে অনেকেই খেয়েপরে বেঁচে থাকতে পারছে না। কাজ না থাকার চেয়ে কোনো একটা কাজ থাকা ভাল। এই নীতিতে জোর দেয়ায় বৃদ্ধি পাচ্ছে ছদ্ম বেকারত্ব। মাসে করমুক্ত ৪৫০ ইউরো দিয়ে বেঁচে থাকাটা খুবই কষ্টকর। অনেকেই এটিকে শ্রমবাজারের আমেরিকানাইজেশান বলছেন। এ ছাড়াও রয়েছে অস্থায়ী চাকরির সমস্যা। জার্মানিকে অস্থায়ী চাকরি খাতের স্ফীতি ঘটেছে। ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি জানিয়েছে, গত দশ বছরে অস্থায়ী চাকরির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ। অর্ধেকেরও বেশি অস্থায়ী চাকরির চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তিন মাসেরও কম সময়ে। এদের বেতন স্বাভাবিকভাবেই একই কোম্পানির ফুল-টাইম চাকুরেদের তুলনায় অনেক কম থাকে।
 
ক্ষুদ্র কর্মের খণ্ডকালীন শ্রমিকরা অধিকাংশ সময়েই একাধিক চাকরি করতে ইচ্ছুক থাকে। কিন্তু সে সুযোগ তারা কমই পায়। একটা চাকরি আছে, কিন্তু আরেকটা চাকরি চাই, এমন লোকের সংখ্যা গত দশ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে ১২০ শতাংশ। তাছাড়া ওই চাকরিতেও উপরে উঠে স্থায়ী হবার সম্ভাবনা থাকে ক্ষীণ। স্থায়ী হতে পারে কেবল তারাই, যারা তরুণ এবং খুবই দক্ষ। এই অর্থনৈতিক গতিশীলতার অভাবেই সামাজিক অসমতা বাড়ছে। বয়োজ্যেষ্ঠ ও একক মায়েরাই খণ্ডকালীন ও অস্থায়ী চাকরিতে বেশি নিযুক্ত।
 

শুনতে খারাপ লাগলেও এটি সত্য যে, জার্মানিতে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বাড়ছে। এ তথ্যটিকে সে দেশের অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় না। সুপরিচিত ডি সাইট পত্রিকার সম্পাদকীয়তে সম্প্রতি ব্যঙ্গ করে লেখা হয়েছে, প্রত্যেক জার্মানের বেতন বর্তমান বেতনের চেয়ে শতগুণ বৃদ্ধি পেলেও দারিদ্র্যের হার একই রকম থাকবে। তারা বোঝাতে চাইছে, কাগজে-কলমে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো হয় কিংবা কল্যাণ ভাতা পাওয়ার জন্য অসংখ্য লোক নিজেকে দরিদ্রদের তালিকায় যুক্ত করছে। তাদের যুক্তি, জার্মানির এতো অর্থনৈতিক সাফল্য সত্ত্বেও এতো বেশি দরিদ্র থাকার কথা নয়। তবে তাদের অভিমতে কিছু যায় আসে না, ৬০ শতাংশ জার্মানই মনে করে, অসমতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে দারিদ্র্যও। ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মের্কেল ও তাঁর চ্যালেঞ্জার পিয়ার স্টেইনব্রাক এক টেলিভিশন বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। এতে পিয়ার স্টেইনব্রাকের অভিযোগ ছিল, জার্মানিকে চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু অধিকাংশই কম মজুরির। এতে দরিদ্র জার্মানদের ভাগ্যোন্নয়ন কমই ঘটছে।