‘কবে পাবো জাতীয় পরিচয়পত্র’-এই প্রশ্ন ৪৭ লাখ ভোটারের। কিন্তু যাদের কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে তারাই নিরুপায় হয়ে উত্তর দিচ্ছেন ‘জানি না’। গত এক বছর যাবত্ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বিহীন এসব ভোটার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। যদিও শুধু ভুক্তভোগী ভোটাররাই নয়, খোদ নির্বাচন কমিশনের নীতি নির্ধারকরাও জানেন না, কবে এ জাতীয় পরিচয় পত্র দেয়া হবে। গত এক বছর দফায় দফায় বৈঠক করেও জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ইসি।
এ প্রসঙ্গে ইসি সচিবালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ৪৭ লাখ ভোটারকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। মূলত, সিটি করপোরেশন নির্বাচন ও আসন্ন স্মার্টকার্ড প্রদান ইস্যু জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানে কিছুটা বিলম্ব করছে। আশা করছি দ্রুত সংশ্লিষ্ট ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হবে।
আইনিভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র এখনো বাধ্যতামূলক করা হয়নি। কিন্তু সমস্ত সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক কাজে নোটিশ দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া সরকারি চাকরিতে আবেদন, ব্যাংক একাউন্ট খোলা, সিম কার্ড ক্রয়, জমি ক্রয়-বিক্রয়, পাসপোর্ট তৈরিসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কার্য সম্পাদন সম্ভব হচ্ছে না।
ভোটার তালিকা আইন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী, ‘ভোটার হিসাবে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক নাগরিক, নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও শর্ত সাপেক্ষে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার অধিকারী হবেন।’ জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন ২০১০ অনুযায়ী কমিশন অন্যান্য নাগরিককে নির্ধারিত পদ্ধতিতে ও শর্ত সাপেক্ষে জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান করতে পারবে। বর্তমানে ভোটারদেরই জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া হয়। ১৮ বছরের নীচে যাদের বয়স তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
গত বছরের ১৫ মে নতুন ভোটার করার লক্ষ্যে সারাদেশে হালনাগাদ কার্যক্রমে ১৮ বছর বয়সী ৪৭ লাখ নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ৪৭ লাখ ভোটারের একটি অংশ সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু এনআইডি জুটেনি তাদের কপালে। তবে যাদের ভালো যোগাযোগ আছে তারা বিশেষ ব্যবস্থায় এনআইডি সংগ্রহ করতে পারছেন।
এনআইডি না দেয়ার নেপথ্যে
বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভোটারদের হাতে উন্নতমানের স্মার্টকার্ডের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু নিজেদের মধ্যে স্মার্টকার্ড প্রদান নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হওয়ায় ওই কার্ড প্রদানে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কমিশন। সংশ্লিষ্ট ৪৭ লাখ ভোটারকে স্মার্ট কার্ড না কি লেমিনেটিং করা ম্যানুয়াল কার্ড দেয়া হবে তা নিয়েই মূলত এ মতবিরোধ তৈরি হয়। পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের একটি পক্ষ বলছেন, বিদ্যমান ভোটারের পাশাপাশি ৪৭ লাখ ভোটারকে স্মার্টকার্ড দেয়ার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শুরু করা হোক। অন্যপক্ষ চাচ্ছে ১৫ বছর বয়সীদেরও তথ্য সংগ্রহ করে স্মার্টকার্ড দেয়া হোক। যদিও বিশ্বব্যাংক চায় ১৫ বছর বয়সীদেরও স্মার্টকার্ডের আওতায় আনতে। এজন্য আইনও সংশোধন করা হয়। ৪৭ লাখ ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র না পাওয়া সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিনকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বিভিন্ন দেশের ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বিদ্যমান ভোটার তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫২ জন। এর মধ্যে ৪৭ লাখ ভোটার জাতীয় পরিচয়পত্র পাননি।