‘মানবপাচার বৈধ অভিবাসনের জন্য হুমকি’

 
রাজধানীতে এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন—মানবপাচার নব্য দাসপ্রথার জন্ম দিয়েছে। দেশের মানব সম্পদ ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় দুর্বৃত্তায়নের কারণে বাংলাদেফশরা কঠিন মূল্য দিচ্ছে। সমুদ্র পথে অবৈধভাবে মানব‍পাচার বন্ধ করতে না পারলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবম‍ূর্তি আরও খারাপ হতে পারে। একই সাথে এটি বৈধ অভিবাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। তাই মানবপাচার বা অবৈধ অভিবাসন বন্ধে সরকারকে আন্তরিক ও যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পাচারকারী ও দায়িত্বে পালনে ব্যর্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ ও অভিবাসন খাতের দুর্বৃত্তদের দমন করতে হবে।
 
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘মানবপাচার বন্ধে করণীয়’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
 
অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজনের সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন—দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ থেকে মানবপাচার হয়ে আসছে। কিন্তু সরকার আমাদের নাগরিকদের পাচার হওয়া বন্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেনি। তাই মানবপাচার বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক-কর্মীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারেও সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
 
জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্টিনা লুংডেল বলেন—দুই থেকে তিন হাজার ডলার ব্যয় করে এদেশের মানুষ সমুদ্র পথে বিদেশ যাচ্ছে। কিন্তু যারা আদৌ দেশের বাইরে যেতে চায় না তাদেরকেও সাগরে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। এদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
 
স্টিনা লুংডেল বলেন—২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ২৫,০০০ ব্যক্তি অবৈধভাবে দেশত্যাগ করে। এই সংখ্যা ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই ২৫ হাজার উদ্বাস্তুর ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ মিয়ানমারের, আর বাকি প্রায় সব যাত্রীই বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা থেকে গিয়েছিল। মানবপাচারের গোটা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তা। এদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এত বড় অপকর্ম সম্ভব নয়। অবৈধ অভিবাসন রোধে সবাইকে নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
 
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন—বাংলাদেশে দারিদ্র্যের পরিমাণ বা মাত্রা কমলেও এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এ বৈষম্যের কারণে মানবপাচার বাড়ছে। রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন—বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ইস্যুর যথাযথ সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
 
মূল প্রবন্ধে সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন—সম্প্রতি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে একটি নগ্ন ধরনের নব্য দাসপ্রথার আবির্ভাব ঘটছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং মালয়েশিয়ার একদল মানুষ এ অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। মানবপাচার, জিম্মিকরণ, জবরদস্তিমূলক কারারুদ্ধকরণ, এমনকি হত্যা তাদের অপকর্মের অংশ।
 
তিনি বলেন—সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ থেকে বহির্বিশ্বে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গিয়েছে। একই সময় প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণও পূর্বের তুলনায় কমে যায়। অবৈধ অভিবাসনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো ক্রমাগতভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা হ্রাস।
 
মূল প্রবন্ধে বলা হয়—বিনিয়োগের স্থবিরতার কারণে গ্রামে অন্য কোনো বিকল্প কর্মসংস্থানেরও সুযোগ নেই। তাই জীবন-জীবিকার সন্ধানে মানুষ বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। সরকারিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীসহ নানা ধরনের কার্যক্রম প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে যথাযথভাবে না পৌঁছানোও মানবপাচারের অন্যতম একটি কারণ। সমাজে ন্যায়পরায়ণতার অভাব থাকলে এবং বৈষম্য বিরাজ করলেও উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে ধনীরা আরো ধনী হলেও দরিদ্রদের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এ অবস্থায় মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবন-জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
 
সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন—সরকারি উদ্যোগে বিদেশে শ্রমিক-কর্মী প্রেরণের কার্যক্রম ব্যর্থ হয়েছে। সরকার এটি নিয়ে ব্যবসা করতে পারে না। সঠিক তদারকির মাধ্যমে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে অভিবাসী প্রেরণের কাজ করতে দেয়া উচিত।
 
মানবাধিকার কর্মী হামিদা হোসেন বলেন—মানবপাচার সম্পূর্ণভাবে বন্ধে সংসদে আলাপ-আলোচনা হওয়া দরকার।
 
কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন—অবৈধ অভিবাসন রোধে জাতিসংঘের সাথে সরকারকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। শুধু মানবপাচারকারী নয়, যেসব সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
 
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন—জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এদেশের জনগণের সাগর পাড়ি দেয়ার বড় কারণ রাষ্ট্র তাদের মৌলিক অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারকে মানবপাচারের সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
 
এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সুজনের সহসম্পাদক জাকির হোসেন, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সুমাইয়া ইসলাম প্রমুখ।