মুজাহিদের ফাঁসি বহাল

১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার উস্কানিদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছে।

 
তবে বুদ্ধিজীবী হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অর্থাত্ দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন হত্যার দায় থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। এছাড়া ফরিদপুরের বাকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও হত্যা এবং নাখালপাড়া সেনা ক্যাম্পে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, মুক্তিযোদ্ধা বদি, রুমি ও জুয়েলসহ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে হত্যার নির্দেশের ঘটনায় মুজাহিদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আর ফরিদপুর শহরের রঞ্জিত নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে নির্যাতনের ঘটনায় তাকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ।
 
গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ‘মুজাহিদের ফাঁসির রায় এসেছে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে। এই রায়ে বাংলাদেশের সবাই খুশি হবে। এক শতাব্দীতে এরকম বুদ্ধিজীবী তৈরি হবে না। তবে এইটুকু সান্ত্বনা, বিচার পাওয়া গেল।’
 
অন্যদিকে মুজাহিদের কনিষ্ঠ পুত্র আলী আহমেদ মাবরুর বলেছেন, ‘এই রায়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হয়নি। আমার পিতার বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিলো। কিন্তু আদালতে এটি প্রমাণ হয়নি। কিন্তু বুদ্ধিজীবী হত্যার গণঅভিযোগে ফাঁসি দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, কিন্তু আদালতে এমন কোন সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিলো না যে তিনি অমুক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছেন। বুদ্ধিজীবীদের কোন আত্মীয়-স্বজনও তার বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্য দেয়নি।
 
মুজাহিদের আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন জানিয়েছেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হবে। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের সত্যায়িত নকল পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে হয়। ফলে এসব প্রক্রিয়া সম্পাদন করে রায় কার্যকর করতে ৩/৪ মাসের বেশি সময় লাগতে পারে। যদি না তার রিভিউ মঞ্জুর হয়।
 
২০১৩ সালের ১৮ জুলাই মুজাহিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ট্রাইব্যুনালের এ ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে ওই বছরের ১১ আগষ্ট আপিল করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আপিল নিষ্পত্তি করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে। চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে এ আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়। শেষ হয় গত ২৭ মে। এই এক মাসের মধ্যে নয় কার্য দিবসব্যাপী এই আপিলের ওপর শুনানি হয়। ২৭ মে শুনানি শেষে ১৬ জুন রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে দেয়া হয়।
 
সেই মোতাবেক গতকাল সকাল ৯টায় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতি এজলাশে আসেন। বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
 
এজলাশ কক্ষ ছিলো জনাকীর্ণ। এ সময় আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন আদালত কক্ষে। সকাল ৯টা ৬ মিনিটে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা শুরু করেন। দুই মিনিটের মধ্যে রায় পড়া শেষ হয়। ঘোষণায় বলা হয়, ‘আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হয়েছে।’
 
যে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড
 
প্রধান অভিযোগ ছিলো দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যার উস্কানি, পরিকল্পনাকারী ও নৈতিক সমর্থনদানের। এ সংক্রান্ত অভিযোগে বলা হয়, আল বদরের দুষ্কর্ম ও অপরাধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন। তিনি আল বদর বাহিনীর ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বে ছিলেন। আল বদর সদস্যদের উপর তার কর্তৃত্ব ছিলো না এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথ্য প্রমাণে দেখা গেছে, তিনি কয়েক বার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজে আলবদর ক্যাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। তিনি ভারতের এজেন্ট ও দুষ্কৃতিকারী বলে মুক্তিযোদ্ধাদের খতম করার জন্য আল বদর সদস্যদের উস্কানি দেন।
 
এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায়ে বলা হয়, নাত্সী বাহিনীর এডলফ আইকম্যান কাউকে নিজ হাতে খুন করেননি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাত্সী বাহিনীর নৃশংসতার অন্যতম সংগঠক তিনি ছিলেন। এ অপরাধে পরে তার মৃত্যুদণ্ড হয়। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে, বিভিন্ন পেশার কয়েক শ’ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি দৈনিক অবজারভারের এক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িতরা কুখ্যাত আল বদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেছে বেছে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে আল বদরের সদস্যরা। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনাল বুঝতে সক্ষম হয়েছে আচরণ, বক্তব্য ও বিবৃতির মাধ্যমে এ পরিকল্পনার সঙ্গে মুজাহিদের সম্পৃক্ততা ছিলো। সাক্ষ্য ও দালিলিক তথ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে মুজাহিদ বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। গণহারে বুদ্ধিজীবী হত্যা একটি ‘এক্সটারমিনেশন’ যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’ ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ। এছাড়া এতে মুজাহিদের নৈতিক সমর্থনও ছিলো। তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃত্বের দায় রয়েছে। এজন্য তাকে ট্রাইব্যুনাল আইনের ১৯৭৩ এর ৩ (২) (ক) (চ) ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে ২০(২) ধারায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আপিল বিভাগ এই অভিযোগেই মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন।
 
সিরাজুদ্দীন হত্যার দায় থেকে খালাস
 
মুজাহিদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ বুদ্ধিজীবীদের হত্যার উস্কানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীর অভিযোগ আনা হয়েছিলো। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিলো সিরাজুদ্দীন হোসেনকে হত্যার। অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে আলবদর সদস্যরা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, তার লাশও পরে পাওয়া যায়নি। কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের হত্যার গণঅভিযোগ আপিল বিভাগে প্রমাণিত হলেও সিরাজুদ্দীনকে হত্যার জন্য মুজাহিদের দায় প্রমাণিত হয়নি। এ কারণে এ দায় থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
 
দুটি অপরাধে যাবজ্জীবন
 
ফরিদপুরের বাকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ও হত্যা এবং সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বদি, রুমি, জুয়েলসহ কয়েকজনকে নাখালপাড়া সেনা ক্যাম্পে হত্যা ও নির্যাতনের পৃথক অভিযোগে আপিল বিভাগ তাকে যাবজ্জীবনের দুটি দণ্ড দিয়েছে। ফরিদপুরের বাকচর গ্রামে হিন্দুদের হত্যা ও নিপীড়নের অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ১৩ মে মুজাহিদ সহযোগীদের নিয়ে ফরিদপুর সদর থানাধীন হিন্দু অধ্যুষিত বাকচর গ্রামে হামলা চালান। সেখানে কয়েকজন হিন্দুকে হত্যা করা হয়, এক হিন্দুর বাড়ি লুট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে ওই হিন্দু পরিবার দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়।
 
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৩০ আগস্ট নাখালপাড়ার পুরাতন এমপি হোস্টেলে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে যান মুজাহিদ। সেখানে বন্দী সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমী, জুয়েল, আজাদকে দেখে তারা গালিগালাজ করেন। পরে মুজাহিদের পরামর্শ অনুসারে তাদের অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
 
বাবু নাথকে নির্যাতনের দায়ে ৫ বছরের দণ্ড
 
তিন নম্বর অভিযোগে মুজাহিদকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের জুনের প্রথম সপ্তাহে রাজাকাররা ফরিদপুরের রথখোলা গ্রামের রণজিত্ নাথ ওরফে বাবু নাথকে খাবাসপুর মসজিদের কাছ থেকে ধরে পুরাতন সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়। সেখানে উপস্থিত মুজাহিদের ইঙ্গিতে রাজাকার ও অবাঙালিরা তাকে হত্যার উদ্দেশে বিহারি ক্যাম্পের পূর্ব দিকে জনৈক আবদুর রশিদের বাড়িতে নিয়ে আটকে নির্যাতন করে। রাতে রণজিত্ পালাতে সক্ষম হন।
 
দুটি অভিযোগ বিবেচনায় নেয়নি আপিল বিভাগ
 
দ্বিতীয় অভিযোগে (ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে হিন্দু গ্রামে গণহত্যা) এবং চতুর্থ অভিযোগের (আলফাডাঙ্গার মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা) সত্যতা পাওয়া গেলেও তাতে মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে খালাস দিয়েছিল। এ কারণে এ দুটি অভিযোগ আপিল বিভাগের রায়ে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
 
মুজাহিদের পরিচিতি
 
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মুজাহিদের পরিচিতি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এই মামলার আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ছাত্রাবস্থায় ইসলামী ছাত্র সংঘে (জামায়াতের তত্কালীন ছাত্র সংগঠন) যোগ দেন। ১৯৬৮-৭০ সালে তিনি ফরিদপুর জেলা ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ওই বছরই তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র সংঘের সেক্রেটারি হন। একাত্তরের অক্টোবরে তিনি ছাত্র সংঘের সভাপতি ও আল-বদর বাহিনীর প্রধান হন বলে দাবি করা হয়। আসামি ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে চারবারই পরাজিত হন। ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন।
 
যারা মামলা পরিচালনা করেছেন
 
আপিলের ওপর মুজাহিদের পক্ষে আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, এসএম শাহজাহান ও শিশির মো. মনির এবং রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজউদ্দিন ফকির এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ।
 
আপিলের রায়ে সংক্ষুব্ধ মুজাহিদের ছেলে
 
আপিল বিভাগের রায়ে সংক্ষুব্ধ বলে জানিয়েছেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ মাবরুর। রায় ঘোষণার পর তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সর্বোচ্চ আদালতেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পায়নি।
 

তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহাবুব হোসেন বলেন, আমরা মনে করি মৃত্যুদণ্ড দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ এ মামলায় ছিল না। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে ১৫ দিনের মধ্যে আমরা রিভিউ আবেদন করব। তিনি বলেন, ছয় নম্বর অভিযোগ বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার কথা বলা হয়নি। ঢালাওভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আপিল বিভাগ আবেদন বিবেচনা করবেন এবং এই ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত আসবে।