দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়াই লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। একই সঙ্গে আমরা গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। আর এর মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ব্রিটেনের আরো সহায়তা কামনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে এবং উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবুও ব্রিটেনের কাছ থেকে আরো সহায়তা আমাদের প্রয়োজন। বাংলাদেশের জনগণের জন্য ব্রিটেন তাদের সহায়তা অব্যাহত রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

 
যুক্তরাজ্যে ছয় দিনের সফরের চতুর্থ দিন স্থানীয় সময় সোমবার বিকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) যুক্তরাজ্য শাখার কার্যালয়ে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত এমপিদের জন্য এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের চেয়ারম্যান ভারতীয় বংশোদ্ভূত এমপি কিথ ভাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেন্ট ভবনে পৌঁছলে হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন বারকাউ তাকে স্বাগত জানান।
 
অনুষ্ঠানে ব্রিটেনকে বাংলাদেশের প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ ও ব্রিটেন দু’দেশের পারস্পরিক কল্যাণে এক সঙ্গে কাজ করে যাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টিকে গুরত্ব দেয়া হয়েছে। সেখানে সব ধর্মের মানুষ তার মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সকল আর্থ-সামাজিক খাতে ভালো অগ্রগতি লাভ করছে। আমরা নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছি এবং বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি।
 
বাংলাদেশে সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, চিরদিনের জন্য এ অঞ্চল থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করার একটি অভিন্ন লক্ষ্য আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, আমি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যাতে আমরা সকল সমস্যা সমাধান করতে পারি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্য নির্মূল এবং জনগণকে সকল মৌলিক সুবিধা প্রদান করা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলেন, শ্রমিকরা যাতে তাদের কর্মস্থলে সুষ্ঠু পরিবেশ পায় সে লক্ষ্যে সরকার যত্ন নিতে শুরু করেছে। দারিদ্র্য হার হ্রাসের লক্ষ্যে সরকারের প্রয়াসের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য হার ইতোমধ্যে ২২ দশিমক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং আমরা আগামী সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চাই।
 
প্রথমবার নির্বাচিত ব্রিটিশ এমপিদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছে। কিন্তু আপনারা ভাগ্যবান যে আপনারা গণতন্ত্র ব্যবস্থা উপভোগ করছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাও ওয়েস্টমিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্র অনুসরণ করার চেষ্টা করছি। এটি একটি কঠিন কাজ। তা সত্ত্বেও আমরা এ লক্ষ্যে ক্রমান্বয়ে অগ্রগতি লাভ করছি।
 
টিউলিপ সিদ্দিকের এমপি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, টিউলিপ যখন জন্ম নেন তখন তিনি লন্ডনেই ছিলেন। আমার এখনো মনে আছে যে আমি প্রথমবার তাকে ‘টিউলিপ’ ফুলের মতোই দেখেছিলাম। এখন সে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। গর্বে আমরা বুকটা ভরে যায়। আমি তার সর্বাঙ্গীণ সাফল্য এবং দীর্ঘায়ু কামনা করি।
 
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, বাংলাদেশ আইটি খাতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এখন গ্রামগুলো ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।
 
প্রথমবার যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ায় অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন এলাকা থেকে লেবার পার্টির এমপি নির্বাচিত হওয়া একটি বিরাট সম্মানের বিষয়। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বেশকিছু সংখ্যক নারী নির্বাচিত হওয়ায় আমরা গর্বিত। আমরা এ বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নিতে পারি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সরকারের সর্বোচ্চ পাঁচটি পদে নারী রয়েছেন। টিউলিপ বলেন, আমরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে অত্যন্ত গর্বিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং তিনি গত নির্বাচনে সফল হওয়ার ব্যাপারে আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন।
 
স্বাগত বক্তৃতায় কিথ ভাজ একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাহসের সঙ্গে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করে বলেন, তাকে (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) এ অনুষ্ঠানে পাওয়া বিরাট সম্মানের বিষয়। তিনি অন্যদের জন্য নিজেই অনেক নজির স্থাপন করেছেন। কনজারভেটিভ পার্টির এমপি এ্যান মেইন বক্তৃতাকালে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
 
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, রেদোয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. আবদুল হান্নান এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব একেএম শামীম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। এ সময় রুশনারা আলী, ড. রূপা হক, জিমি ফিটজপ্যাট্রিক, ব্যারোনেজ পলা উদ্দিনসহ প্রায় ৩০ জন এমপি এবং সিপিএ যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী এন্ড্রু টাগি উপস্থিত ছিলেন।
 
এদিকে প্রথমবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত টিউলিপ সিদ্দিক গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় দুপুরে হাউস অব কমন্সে ভাষণ দেন। এ সময় হাউজ অব কমন্সে পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানাসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
 
প্রধানমন্ত্রী ফিরছেন আজ :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যে ছয় দিনের সফর শেষে আজ বুধবার দেশে ফিরছেন। স্থানীয় সময় বিকাল ৬টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ১১টা) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে লন্ডন হিথ্রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে তিনি যাত্রা করবেন।
 

যুক্তরাজ্য সফরকালে প্রধানমন্ত্রী পার্ক লেনে অবস্থিত হিল্টন হোটেলে উঠেন। তিনি লন্ডনের একটি হাসপাতালে চোখের চিকিত্সা নেন। তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। ভারতের সাথে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অর্জনের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ এ সংবর্ধনার আয়োজন করে।