তবে কি এবার জেলা পরিষদ নির্বাচন!

স্থানীয় সরকারের অন্যতম স্তর জেলা পরিষদে ৪২ বছরেও নির্বাচন হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের সকল স্তর জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত হবার বিধান থাকলেও এসব বিধিবিধান অকার্যকর রয়েছে দীর্ঘকাল। অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিরাই চালাচ্ছেন জেলা পরিষদ। তবে গত ৪ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বাজেট পেশকালে লিখিতভাবে স্থানীয় সরকার পরিচালনার বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেন। এরমধ্যে জেলা পরিষদে নির্বাচন হওয়া আবশ্যক উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেছেন, স্থানীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভার মতো জেলা পরিষদেও নির্বাচিত ব্যক্তি থাকা দরকার।

 
স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেছেন, বাজেট বক্তৃতায় জেলা পরিষদের নির্বাচন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর গুরুত্ব আরোপের পর এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। প্রাথমিক প্রস্তুতিও রাখা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে বাজেট অধিবেশন শেষ হলেই এ বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন আয়োজনে বেশি সময় লাগবে না বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান। 
 
প্রসঙ্গত মৌলিক গণতন্ত্রের আদলে গঠিত জেলা পরিষদে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানেও জেলা বোর্ড গঠন করা হতো নির্ধারিত মেয়াদের জন্য। মেয়াদ শেষে আবার নতুন বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণের বিধান কার্যকর ছিল।
 
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ ২০১২ সালের ১৫ অক্টোবর দেশের ৬১ জেলা পরিষদে (তিন পার্বত্য জেলা বাদে) প্রশাসক নিয়োগ দেয়। এসব প্রশাসকের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা।
 
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ ইতিমধ্যে আইনের দ্বারা ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পরিষদকে প্রশাসনিক ইউনিট ঘোষণা করা হয়েছে। পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনও এর অন্তর্ভুক্ত।
 
নির্বাচনের বিধান রেখে প্রতিটি ইউনিটের জন্য আলাদা আইনও করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও হয়েছে। কিন্তু ব্যতিক্রম কেবল জেলা পরিষদ।
 
স্বাধীনতার পর ১৯৮৮ সালে জেলা পরিষদগুলোতে সংসদ সদস্যদের চেয়ারম্যান হিসাবে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে জেলা পরিষদে চেয়ারম্যানদের নিয়োগ বাতিল করা হয়।  সে সময়ে বিএনপি সরকার উপজেলা পরিষদের নির্বাচনও বাতিল করে। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদ বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। তখন থেকে উপজেলা আবার থানা হিসাবে পরিগণিত হয়।
 
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করেও তা বাস্তবায়ন করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উপজেলা পরিষদ আইনে পরিবর্তন এনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। এ সরকারের সময়ে পৌরসভা-সিটি করপোরেশন, এমনকি ইউনিয়ন পরিষদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ গত সোমবার হয়ে গেল উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন।
 
ইতিপূর্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা পরিষদের নির্বাচন প্রস্তুতির কথা একাধিকবার আলোচনায় তুলেছেন। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব সহিংস পরিস্থিতি এবং গেল ৫ জানুয়ারির পর অনুরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জেলা পরিষদের নির্বাচন প্রসঙ্গ বেশিদূর এগোয়নি। অবশ্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ভিন্নমত প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তিনি স্থানীয় সরকারের স্তর কমিয়ে আনার পক্ষে মতামত দিয়ে আসছেন।
 
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০০০ সালে স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইন সংশোধন করা হয়। শর্তসাপেক্ষে পরোক্ষ নির্বাচনের বিধানও রাখা হয় সংশোধিত আইনে। 
 

স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) আইনের ১৯ ধারায় চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নির্বাচনের বিষয়ে বলা হয়েছে, পরিষদ প্রথমবার গঠনের ক্ষেত্রে সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা যে তারিখ নির্ধারণ করবে সে তারিখ থেকে পরিষদ গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। এ ছাড়া আইনে নির্বাচনের জন্য আলাদা বিধি করার বিধানও রাখা হয়েছে। যদিও নির্বাচনের জন্য বিধান বা প্রথমবার পরিষদের গঠন বিষয়ে গেজেট প্রকাশ এখন পর্যন্ত করা হয়নি।