ভারতের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে বাংলাদেশকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে অবকাঠামো খাতে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভূটানের সাথে সংযোগের জন্য সড়কপথকে আন্তর্জাতকি মানে উন্নতি করতে হলে প্রতি কিলোমিটারে ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে (বিবিআইএন) সড়কপথে পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচলের চুক্তি বাস্তবায়নে অবকাঠামো উন্নয়ন ও জমি অধিগ্রহণকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ভুটানে চার দেশের সরকার এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদলে যাত্রীবাহী যানবাহন, যেমন বাস ও প্রাইভেট কার এবং পণ্যবাহী যান এই চারটি দেশের মধ্যে চলাচল করতে পারবে। অর্থাত্ বাংলাদেশ থেকে কেউ চাইলে নিজস্ব গাড়ি নিয়ে কলকাতাসহ ভারতের যেকোনো শহরে যেতে পারবেন, একই সঙ্গে ভারতের ওপর দিয়ে নেপালে বা ভুটানে যেতে পারবেন। চার দেশের মধ্যে এই সংযোগ পরিবহন খরচ কমানোর পাশাপাশি চার দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
চুক্তির বিষয়ে বিভিন্ন সম্ভাবনা ও এটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে সিপিডির সংলাপে আলোচনা হয়। সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সঞ্চালনায় এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের। বিশেষ অতিথি ছিলেন—ভারতের হাই কমিশনার পঙ্কজ সরণ, নেপালের রাষ্ট্রদূত হরি কুমার শ্রেষ্ঠা, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট আবদুল মাতলুব আহমাদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবচেয়ে ভালো ফল পেতে সমন্বিতভাবে আঞ্চলিক যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী ওাবয়েদুল কাদের বলেন, আগামী ৩০ জুন ঢাকা ময়মনসিংহ চারলেন সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ হচ্ছে। তাই আগামী ঈদে ওই সড়ক ব্যবহারকারী যাত্রীরা নির্বিঘ্নে বাড়ি যেতে পারবেন।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, গত সাড়ে তিন বছরে আমার ১০৩ বার প্রকল্পস্থল পরিদর্শন করতে হয়েছে। ১৯২ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ১৪০ কিলোমিটারের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। শিগগিরই বাকি কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।
এ সময় তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি গণমাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার-বাংলাদেশ হয়ে কলকাতা পর্যন্ত দ্রুত গতি রেল লাইন নির্মাণের আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। এ রেল লাইন নির্মাণ করা হলে এ অঞ্চলের ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সিপিডির সংলাপে বক্তারা বলেন, অনেক দেরিতে হলেও এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে যা মাইল ফলক। এ ধরনের উদ্যোগের জন্য রাজনৈতিক চেষ্টাই বড় ফল এনে দিয়েছে।
পঙ্কজ শরণ বলেন, আমি যোগযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞ নই। তবে কানেকটিভিটি নিয়ে এ যাবত্ যত আলোচনা হয়েছে তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে, জমি অধিগ্রহণ এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, শুল্কমুক্ত সুবিধা নিয়ে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি গত ৫ বছরে ১০ গুণ বেড়েছে। এই মেয়াদে ভারতের বেড়েছে ৫ থেকে ৬ গুণ।
তিনি বলেন, কানেক্টিভিটির মাধ্যমে দুদেশই লাভবান হবে। এরই মধ্যে বিদ্যুত্, পানি, ট্রানজিট ও বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হয়েছে। এ কানেক্টিভিটি ভারত, নেপাল, ভূটান ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর বিশাল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। ট্রানজিটের ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের নিয়ে বৈঠক করা উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ট্রানজিট ফি নির্ধারনের সাথে আমাদের এটিও দেখতে এর ফলে এ অঞ্চলের উপকারভোগীদের উপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে।
পঙ্কজ সরণ আরো বলেন, সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের জন্য ২০০ কোটি ডলারের যে নমনীয় ঋণ দেয়ার ঘোষণা করেছে তা বাংলাদেশের সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারবে।
নেপালের রাষ্ট্রদূত হরি কুমার শ্রেষ্ঠা বলেন, নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের সহায়তার জন্য ১০ হাজার মেট্রিক টন চাল বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে নেপালে গিয়েছে। সড়ক যান চলাচল চুক্তি বাস্তবায়ন সবদেশেই লাভবান হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে চুক্তির ফলে ব্যবসার নতুন নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এ সংযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশসহ এতদঞ্চল ব্যবসা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে শীর্ষ অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের যে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত রয়েছে তা আরো বিকশিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। এতে তিনি চার দেশের জন্য সড়ক পথে বাংলাদেশের আটটি সম্ভাব্য রুটের প্রস্তাব করেন।
তিনি বলেন, এ চুক্তি বাস্তবায়নে তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সঙ্গে স্বচ্ছতা বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। চার দেশের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণে সকল দেশ সমান সুবিধা পাচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে। বিবিআইএস -এমভিএ সার্ক এমভিএ বা ভাতর-বাংলাদেশ এমভিএরে ক্ষেত্রে কানেক্টিভিটির দলিল, প্রটোকল, অনুমোদন পত্র, ফি’র তথ্য, সারচার্জ, ব্যবহারকীর ফির ওয়েবসাইডে প্রকাশ করতে হবে। সকলেই যাতে এ তথ্য পায় সে বিষয়টিও নিশ্চিত করার দাবি জানায় সিপিডি।
ড. মুস্তাফিজ জানান—এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ পূর্ব ভারত থেকে ভারতের অন্য অংশে রেল কার্গোর ব্যয় দুই-তৃতীয়াংশ কমে আসবে। অন্যদিকে সড়কের টন প্রতি ১৫০ ডলার থেকে ব্যয় কমে হবে প্রতিটনে ৫০ ডলার। ফলে আন্তর্জাতিক মানে ফ্রি বা চার্জ নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া র্ভতুর্কী ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ করার প্রস্তাব করেন তিনি।