কন্যার জন্মদিনে ‘রাজ্য’ উপহার

রাজা হয়েও তিনি কেবল সন্তানদের শাসন করতে পারবেন।  রাজা হয়েও সব সময়ই তার মনে থাকবে যে বিষয়টি, মেয়েকে সত্যিকারের রাজকুমারী বানাতে গিয়েই এ পদে অধিষ্ঠান। তবে তিনি যে বিষয়টিতে মুখ খুলছেন না, সেটি হল, কারা কারা তার রাষ্ট্রের বাসিন্দা হবেন

কন্যাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে কথা, সেতো রক্ষা করতেই হয়। সত্যিকারের রাজকুমারী বানাতে গত জুনে মিসর ও সুদানের মধ্যখানে অসামন্তরাল বাহুবিশিষ্ট চতুর্ভূজাকৃতির এক অদখলকৃত ভূমিকে নিজের দাবি করে রাষ্ট্রীয় পতাকা গেড়েছিলেন জেরেমিয়াহ হেটন। জন্মদিন উপলক্ষে আদরের কন্যাকে দেয়া বিশেষ উপহার ছিল সেটি।  মিসর ও সুদানের কেউই দাবি না করা বির তাওয়িল নামে পরিচিত অঞ্চলটিকে হেটন আখ্যা দেন ‘দ্য কিংডম অফ নর্থ সুদান’। সেই থেকে সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে এর পক্ষে-বিপক্ষে চলছে জোর প্রচারণা। বিরোধীদের অনেকে এটিকে ‘বোকামি’ ও ‘ঔপনিবেশিকরণ’ অপবাদ দিচ্ছেন। হেটন জানিয়েছেন, জোরালো প্রতিবাদ আসছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে। তারা প্রকল্পটিকে ‘আধুনিক যুগের উপনিবেশবাদ’ বলতে শুরু করেছেন।
 
রাষ্ট্রটির নামকরণ করা হয়েছে অফিসিয়াল ম্যাপ ও জাতিসংঘের স্বীকৃতি ছাড়াই। এমনকি হেটনের দেশ যুক্তরাষ্ট্রেরও অনুমোদন মেলেনি। তবে এক বছরেরও কম সময় পর মনে হচ্ছে, শেষ হাসি হাসার সুযোগ হয়তো পেয়েও যেতে পারেন হেটন। তার পরিবারের কাহিনী নিয়ে এরইমধ্যে সিনেমা বানানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ডিজনি। প্রযোজকদের একজন হবেন সুপার সাইজমি’র মর্গান স্পারলক। কারও দখলে না থাকা অঞ্চলটিতে পতাকা গেড়ে তার পাশে তোলা নিজের ছবি পোস্ট করে রীতিমতো হৈচৈ ফেলে দেন হেটন। ব্রিস্টন হেরাল্ড কুরিয়ার ও এসোসিয়েটেড প্রেস সেই কাহিনী লুফে নিয়েছিল। ডিজনি চুক্তির পর নতুন রাষ্ট্রের গল্প আবার লাইমলাইটে উঠে এসেছে। কৃষক হেটন (তিনি আবার সেফটি মাইনিং কোম্পানিও চালান) জানিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রের পরিকল্পনার মধ্যে অনেকের উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের গন্ধ খোঁজাকে তার কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছে।
 
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিয়ে আফ্রিকার কোনো দেশের রাজা বা রাজকুমারী বনে যাবার বিষয়টি অবশ্য একটু অদ্ভুতই বটে। তবে ‘নতুন রাজা’ জোর ধরেই বলছেন, কারও আয়ত্তে না থাকা একটি অঞ্চলে দ্য কিংডম অফ নর্থ সুদান গঠন করার মাঝে অবৈধ কিছু নেই। তার যুক্তি, ‘উপনিবেশবাদের সংজ্ঞা হল সম্পদ ও পণ্য কেড়ে নেয়ার উদ্দেশে এক দেশটি আরেক দেশের কেড়ে নেয়া। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করি না আর অঞ্চলটি একবারেই পরিত্যক্ত।’
 
কীভাবে কী করবেন, অর্থাত্ রাজ্য পরিচালিত হবে কীভাবে, তার উপরই পরিবারটির সমস্ত মনযোগ এখন। হেটনের সাহায্যার্থে অবশ্য অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। আত্মস্বীকৃত বিজ্ঞানপ্রেমীর একটি দল নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি টেকসই খাদ্য উত্পাদন প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের জন্য মাথা খাটাচ্ছে। নস্ফিলা ‘নতুন রাষ্ট্রে’ বিশাল বাগান তৈরি করে জনগণের খাদ্যের যোগান দিতে চান হেটন। স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করেই তিনি পৃথিবীর সবচে’ শুকনো অঞ্চলগুলোর একটিকে বেছে নিয়েছেন। এছাড়া যে আর কোন উপায়ও ছিল না। বির তাওয়িলের  মতো (কারও দাবি নেই এমন) ভূমির খোঁজ যে আর জানা নেই তার।
 
হেটনের পরিকল্পনা মাফিকই সবকিছু এগুচ্ছে, তবে খুব ধীর গতিতে। প্রথম কাজটিই হচ্ছে রাষ্ট্রের সীমানা ঘোষণা করা ও এটি নিশ্চিত করা যে, অন্য কোনও সরকারেরই অঞ্চলটিকে পরিচালনার ইতিহাস নেই। দ্বিতীয়টি, বির তাওয়িল অঞ্চলকে শাসনের ইচ্ছার কথা সারা বিশ্বকে জানানো। তৃতীয় ও শেষ ধাপটি একটু জটিল, অঞ্চলটিকে পুরোপুরিভাবে অধিকারভুক্ত করে প্রতিবেশী দুই দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, যদিও তিনি ভাল করেই জানেন যে, পরিত্যক্ত এই মরুভূমি সম্পূর্ণরূপে বসবাসের অযোগ্য। সুদান ও মিশরের কেউই এখন পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রটিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
 
হেটনের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। বিস্তৃত পরিসরের বিদ্যুত্ সুবিধা তৈরি করতে চান তার দেশে। এতে যে শুধু নিজেদের চাহিদাই মিটবে তা নয়, বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে চান প্রতিবেশী দুই দেশ মিশর ও সুদানে। কোন ধরনের বিদ্যুত্ উত্পাদিত হবে, এ সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে কিছু না বললেও শুধু এটুকু জানিয়েছেন, তা হবে নবায়নযোগ্য। হেটনের দেশে কৃষিবিদ, পানি বিশুদ্ধকরণ বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু বিশারদসহ নানা ধরনের বিশেষায়িত লোকের সমারোহ ঘটবে। সম্মিলিতভাবে তাদের প্রথম কাজটিই হবে খাদ্য অনিশ্চয়তার সমাধান বের করা। তার তথ্যানুসারে ব্রিটেন এখনই তাকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করছে। তার মানে তাকে ও তার দেশকে মানতে মিসরের কোনও আপত্তি নেই।
 
দ্য কিংডম অফ নর্থ সুদানকে জনগণের দানে পরিচালিত পৃথিবীর প্রথম রাষ্ট্র বানাতে চান হেটন। সে লক্ষ্যে পরিবারটি তহবিল গঠন করা শুরু করে দিয়েছে। ১৫ মার্কিন ডলার দান করলে দিচ্ছেন স্মারকস্বরূপ এক বিশেষ স্টিকার। ২৫ মার্কিন ডলার দিলে মিলছে মহানতার শিরোপা। কেউ যদি রাষ্ট্রের রাজধানীর নামকরণ করতে চান, তাহলে দিতে হবে ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখন পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ১০০ ডলার সংগৃহিত হয়েছে। তবে হেটন আশা করছেন, ৪২ দিনের সময়সীমায় জমা পড়বে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি।
 

সার্বভৌম রাজা হয়তো হবেন হেটন; কিন্তু তিনি বেশি পছন্দ করবেন নিজেকে তহবিল সংগ্রাহকদের প্রধান হিসেবে দেখতে। নতুন একটা দেশে রাজতন্ত্র কায়েম করবেন তিনি, এ কথা ভেবে তিনি শিহরিত হন। তবে পদটি হবে নিছকই আনুষ্ঠানিক। রাজা হয়েও তিনি কেবল সন্তানদের শাসন করতে পারবেন। রাজা হয়েও সব সময়ই তার মনে থাকবে যে বিষয়টি, মেয়েকে সত্যিকারের রাজকুমারী বানাতে গিয়েই তার এ পদে অধিষ্ঠান। তবে তিনি যে বিষয়টিতে মুখ খুলছেন না, সেটি হল, কারা কারা তার রাষ্ট্রের বাসিন্দা হবেন।