টেলিভিশন ক্যামেরায় বারবার মাশরাফির মুখ দেখাচ্ছিল; নানারকম দুষ্টুমি করছেন। সাকিব চার মেরে ফিফটিতে পৌঁছাতেই দারুণ একটা ভঙ্গি করলেন। অপেক্ষা এবার আর একটি মাত্র রানের। সব খেলোয়াড় সারি বেঁধে বাউন্ডারির কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। অক্ষর প্যাটেলের বলটা সাব্বির থার্ড ম্যানে পাঠাতেই শুরু হয়ে গেলো উল্লাস। খেলোয়াড়রা খুব উচ্ছ্বাসে ভেসে না গেলেও গ্যালারি জুড়ে, দেশ জুড়ে শুরু হয়ে গেলো ইতিহাস গড়ার উল্লাস; ভারতকে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ৬ উইকেটের অনায়াস ব্যবধানে হারানোর উল্লাস।
এই ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ নিশ্চিত করলো ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলা। এই ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলো ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলার দিকে। এবং সর্বোপরি এই ম্যাচ জিতে ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচ হাতে রেখে ইতিহাসের প্রথম সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো মাশরাফি বিন মুর্তজার দল।
সময়টাই এখন বাঁধভাঙা উল্লাস করার সময়।
এই জয়টাও এলো বাংলাদেশের বাহাতি পেসার, মাত্রই কৈশোর পার করা লিকলিকে তরুণ মুস্তাফিজুরের আরও একটি বিধ্বংসী পারফরম্যান্সে ভর করে। বৃষ্টিবিঘ্নিত প্রথম ইনিংসে ৪৫ ওভারে ঠিক ২০০ রানে অলআউট হয়েছে ভারত; মুস্তাফিজ ৪৩ রানে নিয়েছেন ৬ উইকেট। জবাবে কমে আসা ৪৭ ওভারেরও ৯ ওভার হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করলো বাংলাদেশ।
ছোট লক্ষ্যের ম্যাচগুলোতে বিপদও বেশি থাকে। তামিম ইকবাল শুরুতে একটা জীবন পেয়েও ১৩ রানে আউট হয়ে যাওয়ায় একটু ভয়ও তৈরি হয়েছিল। তারপরও বাংলাদেশের টপ ও মিডল অর্ডারে সৌম্য, লিটন, মুশফিকের তিনটি তিরিশোর্ধ্ব ইনিংসে সবসময়ই পথে ছিল দল। আর শেষ পর্যন্ত ৫১ রানে অপরাজিত সাকিব ও ২২ রানে অপরাজিত সাব্বির ঐতিহাসিক এই জয় সঙ্গে নিয়েই মাঠ ছাড়েন।
এর আগে টসে জিতে ব্যাটিং করতে নামা ভারতের ৪৫তম ওভারেই নামে বৃষ্টি। কয়েকবার বৃষ্টির আসা যাওয়া মিলিয়ে প্রায় দু’ঘন্টা খেলা থেমে থাকে। এরপর যখন খেলা শুরু হয়, ম্যাচের দৈর্ঘ্য নেমে আসে ৪৭ ওভারে। সে পর্যন্তও যেতে পারেনি ভারত। খেলা শুরু হওয়ার পর একমাত্র যে বলটি করতে পারলেন, তাতে ভারতের নবম ও নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন মুস্তাফিজ। আর পরের ওভারে ভুবনেশ্বর কুমারকে আউট করে ইনিংস শেষ করে দেন রুবেল হোসেন।
ইনিংসের মাঝে বৃষ্টি বাধা দেয়ায় ডার্কওয়ার্থ লুইস মেথড প্রয়োগ করে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারিত হয় ৪৭ ওভারে ২০০; ২০১ নয়।
ব্যাটিংয়ে যাই হোক, বোলিং জুড়ে ছিল মুস্তাফিজ ও তার কাটারের দাপট। আগের দিন এই অস্ত্রে ঘায়েল করেছিলেন রোহিত শর্মা, রায়না, রাহানে, জাদেজার মতো সেট ও ইনফর্ম ব্যাটসম্যানদের। গতকাল শুরুই করলেন যেন আগের ম্যাচের শেষ থেকে। এ ম্যাচে একেবারে প্রথম ওভার থেকেই শুরু মুস্তাফিজ তাণ্ডবের। প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই মুস্তাফিজের স্বাভাবিক বেরিয়ে যেতে থাকা বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে পয়েন্টে নাসির হোসেনের অসামান্য এক ক্যাচের শিকার হলেন রোহিত শর্মা।
এরপর জুটি করে এগিয়ে যেতে থাকা শিখর ধাওয়ান ও বিরাট কোহলিকে ফেরালেন এদিন হঠাত্ আবার বোলার হিসেবে ঝলসে ওঠা অফস্পিনার নাসির হোসেন। শেষমেশ নাসির ১০ ওভারে মাত্র ৩৩ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ২ উইকেট। এরপর রুবেল দ্রুত ফেরালেন আম্বাতি রাইডুকেও। তবে এখান থেকেও দাঁড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক ধোনি ও রায়না।
আর এই দাঁড়ানোর বিপক্ষেই রুখে দাঁড়ালেন মুস্তাফিজ।
রায়নাকে আরও একবার শর্ট-কাটারে চরম বিভ্রান্ত করলেন। এরপর ধোনি ও অক্ষর প্যাটেলকে পরপর দুই বলে ফিরিয়ে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি করলেন। কে জানে, এটাও রেকর্ড কি না; ক্যারিয়ারের প্রথম দু’ম্যাচেই হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি করা!
হ্যাটট্রিক না হলেও পরের ওভারেই রবিচন্দন অশ্বিনকে আরও এক ভয়াবহ কাটারে ফিরিয়ে দিয়ে পূর্ণ করলেন নিজের ৫ উইকেট।
শেষ পর্যন্ত বৃষ্টির পর আবার খেলা শুরু হলে নিজের ১০ ওভার কোটা বাকি থাকা একমাত্র বলটিতে আউট করে ফেরান মুস্তাফিজ রবীন্দ্র জাদেজা। এর ভেতর দিয়ে এই ম্যাচে ৪৩ রানে ৬ উইকেট নিলেন তিনি। আর দেশের পক্ষে তৃতীয় সেরা বোলিং ফিগারের মালিক হয়ে গেলেন।
স্কোর কার্ড
ভারত রান বল ৪ ৬
রোহিত শর্মা ক সাব্বির ব মুস্তাফিজ ০ ২ ০ ০
শিখর ধাওয়ান ক লিটন ব নাসির ৫৩ ৬০ ৭ ০
বিরাট কোহলি এলবিডব্লিউ ব নাসির ২৩ ২৭ ৩ ১
ধোনি ক সৌম্য ব মুস্তাফিজ ৪৭ ৭৫ ৩ ০
রাইডু ক নাসির ব রুবেল ০ ৩ ০ ০
সুরেশ রায়না ক লিটন ব মুস্তাফিজ ৩৪ ৫৫ ৩ ০
রবীন্দ্র জাদেজা ব মুস্তাফিজ ১৯ ২৬ ১ ০
অক্ষর প্যাটেল এলবিডব্লিউ ব মুস্তাফিজ ০ ১ ০ ০
রবিচন্দ্রন অশ্বিন ক লিটন ব মুস্তাফিজ ৪ ১০ ০ ০
ভুবনেশ্বর কুমার ক লিটন ব রুবেল ৩ ১০ ০ ০
কুলকারনি অপরাজিত ২ ২ ০ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ৬, ওয়াইড ৮, নোবল ১) ১৫
মোট (অল আউট; ৪৫ ওভার) ২০০
উইকেট পতন: ১/০ (রোহিত শর্মা ০.২), ২/৭৪ (কোহলি, ১২.৩), ৩/১০৯ (শিখর ধাওয়ান, ২০.৫), ৪/১১০ (আম্বাতি রাইডু, ২১.৪), ৫/১৬৩ (সুরেশ রায়না, ৩৫.৩), ৬/১৭৪ (ধোনি, ৩৯.৩), ৭/১৭৪ (অক্ষর প্যাটেল, ৩৯.৪), ৮/১৮৪ (রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ৪১.৬), ৯/১৯৬ (রবিন্দ্র জাদেজা, ৪৩.৬), ১০/২০০ (ভুবনেশ্বর কুমার, ৪৪.৬)।
বোলিং: মুস্তাফিজ ১০-০-৪৩-৬, তাসকিন ৪-০-২৪-০, মাশরাফি ৭-০-৩৫-০, নাসির হোসেন ১০-০-৩৩-২, রুবেল ৭-০-২৬-২, সাকিব ৭-০-৩৩-০।
বাংলাদেশ রান বল ৪ ৬
তামিম ইকবাল ক ধাওয়ান ব কুলকারনি ১৩ ২১ ৩ ০
সৌম্য সরকার এলবিডব্লিউ ব অশ্বিন ৩৪ ৪৭ ২ ১
লিটন কুমার দাস ক ধোনি ব প্যাটেল ৩৬ ৪১ ৫ ০
মুশফিকুর রহিম রান আউট (শর্মা/ধোনি) ৩১ ৩৪ ৩ ১
সাকিব আল হাসান অপরাজিত ৫১ ৬২ ৫ ০
সাব্বির রহমান অপরাজিত ২২ ২৩ ৩ ০
অতিরিক্ত (লেগবাই ৪, ওয়াইড ৯) ১৩
মোট (৪ উইকেট, ৩৮ ওভার) ২০০
উইকেট পতন: ১/৩৪ (তামিম, ৬.২), ২/৮৬ (সৌম্য, ১৬.৪), ৩/৯৮ (লিটন, ১৯.২), ৪/১৫২ (মুশফিক, ২৯.১)।
বোলিং: ভুবনেশ্বর কুমার ৫-০-৩২-০, কুলকারনি ৭-০-৪২-১, রবিচন্দ্রন অশ্বিন ১০-২-৩২-১, রবিন্দ্র জাদেজা ৭-০-২৮-০, অক্ষর প্যাটেল ৭-০-৪৮-১, সুরেশ রায়না ২-০-১৪-০।
টস: ভারত। ফল: ডিএল মেথডে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী