টেকনাফ দিয়ে জোয়ারের মতো ঢুকছে ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ইয়াবা চালান দেশে ঢুকছে। এছাড়াও বিভিন্ন কৌশলে উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও বান্দরবান সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে ইয়াবার চালান। পরে এগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ। টেকনাফে প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের সহায়তায় ইয়াবা ব্যবসা করে কোটিপতি হয়েছেন অনেকে।
গত শনিবার ফেনীতে প্রায় পৌনে সাত লাখের বেশি ইয়াবাসহ পুলিশের এক কর্মকর্তা ও তার গাড়িচালককে আটক করেছে র?্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র?্যাব)-৭। আটক হওয়া ব্যক্তিরা হলেন: পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহফুজুর রহমান ও তার গাড়িচালক মো. জাবেদ আলী। এসময় ইয়াবা বহনের কাজে ব্যবহূত কালো রংয়ের এলিয়ন ব্রান্ডের একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়। মাহফুজুর রহমানের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে আটকের পরেও সংবাদ সম্মেলন করতে পারেনি র্যাব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-৬ এর ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এক স্মারকপত্রের সূত্রে মাদকদ্রব্য অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও গোয়েন্দা) প্রণব কুমার নিয়োগী স্বাক্ষরিত গত ২৩ জানুয়ারির বিশেষ একটি প্রতিবেদনে ৭ প্রভাবশালীসহ ৭৬৪ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর তালিকা তৈরি করা হয়। ইয়াবা পাচারে জড়িতদের হালনাগাদ এই তালিকায় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, ছাত্রনেতা, কর্মচারী, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নাম উঠে এসেছে।
এই তালিকায় টেকনাফের ৭ জন প্রভাবশালী রয়েছে। তারা হলেন- হাজী সাইফুল করিম, সাংসদ বদির ভাই আব্দুস শুক্কুর ও মৌলবী মজিবুর রহমান, আরেক আত্মীয় মংমং ওরফে মমসী, মৌলবী পাড়ার একরাম হোসেন, বদির আরেক আত্মীয় মেম্বার সৈয়দ হোসেন, মো: নুরুল হুদা।
তালিকায় প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম রয়েছে। বান্দরবান, টেকনাফ এবং কক্সবাজারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় অংশ ইয়াবা পাচারে জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র মতে, প্রতিনিয়ত ইয়াবার বড় বড় চালান সরাসরি মিয়ানমারের আকিয়াব ও মংডু বন্দর হয়ে নাফনদী ও সমুদ্রপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। টেকনাফ থেকে ইয়াবা চালান ঢাকা আসতে ৪০টি পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মনোরোগ বিজ্ঞানী ডা. মোহিত কামাল বলেন, দেশে ইয়াবা (অ্যামফিটামিন) ব্যবহার মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে চলেছে। আর একারণে সমাজে নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা ও হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ বাড়ছে। তিনি বলেন, ইয়াবা আসক্তরা জন্মদাতা বাবা-মাকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। খুনের পর খুন কিংবা অপরাধ করলেও এনিয়ে তাদের ভিতরে কোন অনুশোচনা হয় না।
এই মনোবিজ্ঞানী কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বলেন, রাজধানীর চামেলীবাগে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছাত্রী ইয়াবা আসক্ত ঐশী তার পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতা ও মাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কারণ ইয়াবা খেতে খেতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে সেবনকারীর পুরো মানসিক পরিবর্তন ঘটে যায়। ভিতরে ভিতরে সে চরম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। ঐশীর ভেতরে ভেতরে সেই পরিবর্তন ঘটায় সে তার পিতা-মাতাকে হত্যা করে।
জানা যায়, মিয়ানমারের ২৭ কারখানায় উত্পাদিত ইয়াবা চোরাচালান কোনো অবস্থাতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। বরং ইয়াবা চোরাচালান নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এদিকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার জঙ্গলে কয়েকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় এসব নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। এ সুযোগটি লুফে নিয়েছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।
তাছাড়া মিয়ানমারে স্থাপিত ২৭টি ইয়াবা কারখানা বন্ধ করার জন্য পতাকা বৈঠকে বিজিবি মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) কর্মকর্তাদের অনুরোধ করলেও তারা ইয়াবা বিরোধী যৌথ অভিযান পরিচালনার কথা দিলেও তা করেনি। এমনকি বাংলাদেশে আসা ইয়াবা বিক্রির কোটি কোটি টাকা মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. বজলুর রহমান বলেন, ইয়াবা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় হুমকির নাম। কেননা এই নেশায় বুদ হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তরুণরা। ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করা হয়েছে। এই কার্যক্রম এখনো চলমান। আশা করছি এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।