গত ৩২ বছর ধরে বঙ্গোপসাগরে কোন জরিপ হয়নি। জরিপ ছাড়াই বার বার মাছ ধরার বাণিজ্যিক ট্রলারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাছবিচার না করেই ট্রলারের অনুমোদন দেয়ায় সমুদ্রে মাছ ধরাও চলছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। এতে শুধু যে মত্স্য সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে তা নয় ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। এ পরিস্থিতিতে জরুরিভিত্তিতে একটি জরিপ জাহাজ আনতে যাচ্ছে সরকার। ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ জরিপ জাহাজ এলে সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদি জরিপ কাজ চালানোর যে পরিকল্পনা তা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। এর ফলে মাছসহ সকল সমুদ্র সম্পদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র হাতে পাবে বাংলাদেশ।
শুধু মাছ ধরাই নয়, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির পরে যে বিশাল এলাকা বাংলাদেশ পেয়েছে তার নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ আহরণও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি টেরিটরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ বিশাল সম্পদ রক্ষা ও গবেষণা ও আহরণও বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ বিশাল অঞ্চল হওয়ায় সমুদ্রপথে মানব পাচার যেমন বেড়ে গেছে মাত্রাতিরিক্ত হারে তেমনি এ অঞ্চলের কোন কোন দেশ থেকে মত্স্য ট্রলারগুলো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে — যা বাংলাদেশ প্রতিহত করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারত সমুদ্র সম্পদ আহরণ যৌথভাবে কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় এ বিষয়ে দুদেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্র নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে সমুদ্র নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশে মার্কিন সরকার দুটি জাহাজ উপহার দিয়েছে।
সুন্দরবনের সংলগ্ন উপকূল জুড়ে বিশাল চর জেগে উঠেছে। ভাটার সময় দুবলার চর থেকে এই বিশাল চর নজরে আসে। অনুমান করা হচ্ছে এই চর প্রায় ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার। মুক্তিযুদ্ধে ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউদ্দিন। সুন্দরবনের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আজো মেটেনি। তিনি বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনার নতুন দিক প্রসঙ্গে এভাবেই বললেন। এই চরকে এখন থেকেই যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। তিনি বলেন, সুন্দরবনে যেভাবে বনায়ন করা হচ্ছে সেভাবে জেগে ওঠা নতুন চরগুলোতেও বনায়ন প্রকল্প হাতে নিলে চরগুলো দ্রুত জেগে উঠবে। পাশাপাশি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে দলবেঁধে দস্যুরা এসে বাংলাদেশের জেলেদের ওপরে চড়াও হয়ে মাছ, জাল নৌকা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এই জেলেদের নিরাপত্তা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে নির্বিঘ্নে মাছ ধরার পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ে আসার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
মত্স্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সাগরে কী পরিমাণ মাছ রয়েছে এ সম্পর্কিত কোন জরিপ দীর্ঘসময় ধরে হয় না। ১৯৭৩-৭৪ সালে রাশিয়ার একটি জাহাজ দিয়ে সীমিত আকারে সাগরে জরিপ চালানো হয়েছিল। এরপরে ১৯৮৩ সালে নরওয়ের একটি জাহাজও সাগরে সীমিত আকারে জরিপ চালিয়েছিল। এই পর্যায়ে সাগরে কী পরিমাণ মত্স্য সম্পদ রয়েছে তা বলা কঠিন। অথচ পাশের দেশ মিয়ানমার তাদের সমুদ্র এলাকার কোন অংশে কী কী মাছ কী পরিমাণ রয়েছে, কোন কোন মাছ কোন সময়ে বিচরণ করে এ সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করেছে। তার ভিত্তিতে তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারকে মাছ ধরার অনুমতি প্রদান করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে সমুদ্রে কোন জরিপ ছাড়াই এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিপ না করেই কয়েক দফায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারের অনুমোদন দেয়া, সরকার নির্ধারিত জালের ধরন না মেনে মাছ ধরা, চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অন্যান্য মাছের ডিম ও পোনা ধ্বংস করা এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রলারগুলোর গভীর পানিতে মাছ না ধরে কম পানিতে মাছ ধরার কারণে সমুদ্র তলদেশের লতাগুল্ম ধ্বংস হয়ে মাছের বিচরণ ক্ষেত্রকেও ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও দেশের সামুদ্রিক মত্স্য ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের এই মত্স্য ক্ষেত্র যে কোন সময় বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
মত্স্য অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের উপকূলে মাছ ধরায় নিয়োজিত ট্রলারের সংখ্যা প্রায় ৪৩ হাজার। দেশে সমুদ্রগামী মত্স্য জাহাজ রয়েছে ২৪২টি। বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমায় রয়েছে সামুদ্রিক মাছের এক বিশাল ভাণ্ডার। বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছের মধ্যে বাংলাদেশের নৌসীমায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে । প্রতিবছর সাগর থেকে আহরিত হয় প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বেড়ে যাওয়ায় এখন বছরে ১২ থেকে ১৫ লাখ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মত্স্য আহরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেজ্ঞরা বলছেন, জরিপের আগে আমাদের সাগরে কী পরিমাণ মত্স্য সম্পদ রয়েছে তা বলা কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাওসার আহমেদ দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশের নৌসীমায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে এটা একটা ধারণা মাত্র। এর কোন ভিত্তি নেই। এই জরিপ কিন্তু কোন সহজ কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ও চলমান বিষয়। তাই সরকারের উচিত হবে প্রথমেই জরিপের দিকে নজর দেয়া। এর পাশাপাশি সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি সমুদ্রের জলসীমায় আইন-শৃংখলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তবে মত্স্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তরের পরিচালক নাসির উদ্দিন মোঃ হুমায়ূন বলেন, সরকার সামুদ্রিক মত্স্যসম্পদ সংরক্ষণ, আহরণ, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপন্থা নিয়েছে। সুষ্ঠু প্রজনন ও সংরক্ষণের জন্য ইতিমধ্যেই বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বাণিজ্যিকভাবে মত্স্য আহরণ বন্ধ করেছে। ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই এই ৬৫ দিন সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া জরিপ জাহাজ দ্রুত আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।