বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু শেয়ারবাজার ও ব্যাংক লুটপাট এবং অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিচার করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বাবলু বলেন, ‘দেশে সুশাসন নেই, জবাবদিহিতা নেই। যার কারণে জনগণের টাকা লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির দুটো কম্পোনেন্ট। একটি মানি মার্কেট, অপরটি ক্যাপিটাল মার্কেট। মানি মার্কেটে বিশৃঙ্খল অবস্থা।
গত ৫-৬ বছরে বেসিক ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। কারা এই টাকা লুটপাট করেছে, আজ পর্যন্ত কারো নাম বের হলো না। অনেকগুলো কমিটি হয়েছে। হলমার্ক, ডেসটিনি এসব প্রতিষ্ঠান যে টাকা লুটপাট করেছে সে টাকা সরকারের নয়, জনগণের টাকা। এনিয়ে তদন্ত রিপোর্টও পরিষ্কার হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ মন্ত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা সরকারে আছেন জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য, জনগণের টাকা লুটপাট করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য নয়। লুটপাট যেন না হয়, সেটি বন্ধ করার জন্যই আপনারা আছেন। এ পর্যন্ত যত কমিটি করেছেন, তাতে কিছুই করতে পারেননি। একটি টাকাও আদায় করতে পারেননি। যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় আনতে পারেননি। আমরা বিরোধী দলের কেউ এই লুটপাটের টাকার দায় নেব না। একদিন আপনাদের এর জন্য জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ শুধু কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যাবে না।’
বাংলাদেশ থেকে সুইস ব্যাংকে টাকা পাচারের বিষয়ে বাবলু বলেন, গত তিনবছরে হাজার-হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১২ সালে ১ হাজার ৯৯১ কোটি, ২০১৩ সালে ৩ হাজার ১৪৯ কোটি এবং ২০১৪ সালে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর সবই অবৈধ টাকা। যারা দেশের টাকা পাচার করলো তারা কারা? এদের নাম জানতে চাই। যারা টাকা পাচার করছেন তারা আপনার শত্রু, আমাদের শত্রু। এই টাকা ফেরত আনতে হবে, পাচারকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্নদিকের সমালোচনা করে জাপা মহাসচিব বলেন, প্রতিবছরই ঘাটতি বাজেট বেড়েই চলছে। এবারও ঘাটতি বাজেট রাখা হয়েছে ৮৬ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। সরকার এতে কী বুঝাচ্ছে, দেশ এগুচ্ছে? ঢাকায় কিছু ফ্লাইওভার করা মানেই অর্থনীতির উন্নয়ন নয়। দেশি, বিদেশি কোনো বিনিয়োগই নেই। অথচ অর্থমন্ত্রী ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। বক্তব্যের শুরুতে অর্থমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা এখানে নেই। তাহলে কার কাছে আলোচনা করবো। এই আলোচনা কী শুধু সংসদে রেকডিংয়ের জন্য?
তিনি বলেন, আমরা সংসদে সেই বিরোধী দল হতে চাই যারা মানুষের পক্ষে কথা বলবে। আমরা ফাইল ছোড়াছুড়ি ও অশ্রাব্য গালাগালি করতে চাই না। সরকারের পক্ষে কথা বলতে চাই না। সরকারের পক্ষে বলার জন্য ২৫০ জন এমপি আছে। মানুষের ভোগান্তির কথা ও সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরতে চাই।
জিয়াউদ্দিন বাবলু বলেন, শুধু কিছু শিল্প উন্নয়ন হলেই দেশের উন্নতি হবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসগক চারলেনে উন্নীতকরণের বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী বলেন-এই করছি, আজ করবো, আগামী মাসে হবে। আর কতবছর লাগবে। সময় যতো বাড়ছে, ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আর কথা শুনতে চাই না, কাজ দেখতে চাই। ঢাকা চট্টগ্রামে যানজটের কারণে মানুষের কর্মক্ষমতা ও কর্মঘণ্টা কমছে। শিক্ষিত বেকাররা টাইমবোমার মতো। তাদের কর্মসংস্থান দিতে না পারলে সব রূপকল্প ব্যর্থ হয়ে যাবে। ড্রাগ, ইয়াবায় তরুণরা আসক্ত হয়ে পড়ছে। এসব না ভাবলে বাজেট ঝুলে যাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হল দখল বন্ধ না হলে সুশিক্ষা কোনোদিনই হবে না। প্রধানমন্ত্রী তার স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশও কখনও গড়তে পারবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতির নামে এখন অপরাজনীতি চলছে। চলছে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হল দখল ও একে অপরকে গুলি করার ঘটনা। ছাত্রনেতারা এখন গাড়ি-বাড়ি করতে চান। আমাদের সময় আমরা কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভবন চিনতাম না, আমাদের কারও গাড়িও ছিল না। ২৫ বছর ধরে ঢাবি’তে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। ছাত্রসংসদ নির্বাচন না দিলে নতুন নেতৃত্ব কীভাবে বের হবে। বিএনপি দেয়নি, আওয়ামী লীগও দেয়নি। আমাদের স্বৈরাচার বলা হয়। অথচ আমাদের আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছিল।