অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে কানেক্টিভিটি

বাংলাদেশের সঙ্গে সড়কপথে ছয় রুটে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ভারত, নেপাল ও ভুটান। এসব দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী, ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী গাড়ি বাধাহীনভাবে চলাচল করবে। এ উদ্দেশ্যে গত ১৫ জুন ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যাত্রী, ব্যক্তিগত ও পণ্যবাহী যান চলাচলের নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে মোটরযান চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
 
ইতিমধ্যে চার দেশের গাড়ি চলাচলের রুটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোতে পারাপারের ক্ষেত্রে পণ্যবাহী গাড়িকে ট্রানজিটের জন্য নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিতে হবে। এছাড়া অন্য দেশে ঢোকা বা বের হবার ক্ষেত্রে রিলিজ অর্ডার ইস্যু করা হবে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাত্রীদের প্রবেশে দ্বি-পক্ষীয় না বহুপক্ষীয় ভিসা লাগবে- তা আলাদা প্রটোকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে।
 
চারদেশে গাড়ি চলাচল-সংক্রান্ত চুক্তির আওতায় মালদ্বীপ বা শ্রীলংকায় পণ্য আমদানি রপ্তানিতে সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট দেশকে নির্ধারিত চার্জ পরিশোধ করে পণ্য খালাস বা বোঝাইয়ের অনুমতি নিতে হবে। নিয়মিত যাত্রী ও অনিয়মিত যাত্রীদের জন্য আলাদা ছাড়পত্র অনুমোদন করবে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো। চুক্তি অনুযায়ী চার দেশের মধ্যে যানবাহন চলাচলে রুট পারমিট নিতে হবে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার সময় মাঝপথে কোনো যাত্রী বা মালামাল তোলা যাবে না। যে দেশের ওপর দিয়ে যানবাহন যাবে, সেই দেশের কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলে তল্লাশি করতে পারবে। কোনো দেশে যদি একটি নির্দিষ্ট পণ্য নিষিদ্ধ থাকে তাহলে সেই দেশের ওপর দিয়ে সংশ্লি­ষ্ট পণ্য পরিবহন করা যাবে না।
 
চুক্তির আওতায় যান চলাচলের জন্য সংশ্লি­ষ্ট দেশের সরকার নির্ধারিত হারে ট্রানজিট ফি আদায় করবে। যে দেশের ওপর দিয়ে যান যাবে সে দেশই ফি নির্ধারণ করবে। ইতিমধ্যে কানেকটিভিটি চুক্তি হলেও শিগগিরই প্রটোকল স্বাক্ষর করে চুক্তিটি কার্যকর করা হবে। চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপের আদলে এই চার দেশের মধ্যে ২০১৬ সালে মোটরযান চলাচল শুরু করা হবে।
 
চার দেশের মধ্যে গাড়ি চলাচলের চুক্তি সইয়ের আগেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন দুই রুটে বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। একটি হলো কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে ভারতের আগরতলা। অন্যটি ঢাকা থেকে ভারতের শিলং হয়ে গৌহাটি পর্যন্ত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ঢাকা সফরকালে এই দুই দেশের মধ্যে দুটি রুটে বাস চলাচলের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে দ্বি-পক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের পাশাপাশি উপ-আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বা সংযোগের বিভিন্ন চুক্তি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া যাবে আশা করা যায়।
 
এ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিতে হলে অবকাঠামো খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখন সেদিকেই। চুক্তি বাস্তবায়নে যথাসম্ভব দ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করাও প্রয়োজন। বাংলাদেশ-ভারতের ক্ষেত্রে শিগগিরই শুরু হবে চুক্তি ও সমঝোতা বাস্তবায়নের পালা। তবে এ প্রক্রিয়ার জন্য উভয় দেশের মধ্যে আরো আলোচনার দরকার রয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এ সম্পর্কিত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হবে। জানা গেছে, বর্তমানে চার দেশ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও ভবিষ্যতে এই চার দেশের সম্মতিতে অন্য দেশও এই কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হতে পারবে।
 
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে কানেক্টিভিটি বাড়াতে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লে­খযোগ্য হচ্ছে— কোস্টাল শিপিং বা উপকূলীয় সহযোগিতা বাণিজ্য নবায়ন, নৌ প্রোটোকল চুক্তি, ঢাকা শিলং গৌহাটি বাস সার্ভিস ও ঢাকা-কলকাতা-আগরতলা বাস সার্ভিস ইত্যাদি। এছাড়া রেল সড়কসহ অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে নতুন করে ২০০ কোটি ডলারের একটি ঋণ চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তি যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়বে। সুদৃঢ় হবে দু’দেশের মধ্যেকার সম্পর্ক। প্রসার ঘটবে ব্যবসা বাণিজ্যের। কম সময়ের মধ্যে দু’দেশের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে। এর ফলে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চমত্কার গতির সঞ্চার হবে। কানেক্টিভিটি বাড়াতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে  দ্রুত চুক্তিসমূহ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
 
সড়ক পথে কানেক্টিভিটির পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে নৌপথে যোগাযোগ বৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকেও কাজে লাগাতে হবে। দু’দেশের ট্রানজিট ফি ও অন্যান্য চার্জসমূহ নির্ধারণ করে এ বছর থেকে সীমিত আকারে নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থা শুরু করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে দু’দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিটি এনিয়ে সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে। নৌপথে কানেক্টিভিটির প্রসার ঘটলে দু’দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার হবে। একসঙ্গে যদি সড়কপথ, রেলপথ এবং নৌপথের কানেক্টিভিটি চালু থাকে, তাহলে বাংলাদেশ অনেক দিক দিয়ে লাভবান হবে। দ্বি-পক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ঘাটতি বিদ্যমান রয়েছে তা ঘুচে যেতে পারে কানেক্টিভিটি জোরদার করার মাধ্যমে।
 
নৌপথে এতদঞ্চলের দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন নতুন রুট চালু করা যেতে পারে। নৌপথ ব্যবহারের জন্য ভারত বাংলাদেশকে ট্রানজিট ফি প্রদান করবে। ওদিকে নেপাল এবং ভুটান বাংলাদেশ ও ভারত উভয়কেই ট্রানজিট ফি দেবে। বর্তমানে ভারত প্রতি বছর বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহারের জন্য ১০ কোটি টাকা ফি হিসেবে প্রদান করছে বাংলাদেশকে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের ৬টি করে মোট ১২টি নৌ ও সমুদ্রবন্দরকে উভয় দেশের পণ্যসামগ্রী বোঝাই এবং খালাসের কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নৌ ও সমুদ্রবন্দর মংলা, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, পানগাঁও এবং আশুগঞ্জ ওদিকে ভারতের কলকাতা, হলদিয়া, করিমগঞ্জ, পান্ডু, শিলঘাট এবং ফারাক্কা রয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নৌপথে ট্রানজিট সুবিধা চালু করতে গেলে বহমান নদীগুলোতে কমপক্ষে প্রায় ৫২ লাখ কিউবিক মিটার ড্রেজিং নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে সহজভাবে নদীপথে পণ্যবোঝাই নৌযানগুলো চলাচল করতে পারবে। ইতিমধ্যে নদীপথগুলোর গভীরতা বাড়াতে ড্রেজিং এর জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোতে প্রায় ৩ হাজার পণ্যবাহী নৌযান চলাচল করে। এ বছরের শেষ নাগাদ আরো নতুন প্রায় ২০টি নৌযান চালুর সম্ভাবনা রয়েছে।
 
দুই দেশের মধ্যে বাস সার্ভিস চালুর মাধ্যমে উভয়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও অধিক সুবিধা ভোগ করবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। এতদিন তাদের দীর্ঘ ঘুরপথে কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য পথে যেতে হতো। এখন তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সেসব জায়গায় যেতে পারবে। অন্যদিকে ঢাকা-শিলং-গৌহাটি বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ বাংলাদেশে বেড়াতে আসবে। এতে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প লাভবান হবে।
 
কোস্টাল শিপিং বা উপকূলীয় পরিবহন দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে। কারণ, এই চুক্তি কার্যকর হলে উভয় দেশের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমবে। কিন্তু চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের যে সুবিধা দেয়া হচ্ছে তার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পরিমাণ মাশুল পাবে সেটি স্পষ্ট করা হয়নি চুক্তিতে। ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে নৌ ও সড়ক দুটি পরিবহনই ব্যবহার করতে চাইবে, তাছাড়া কোস্টাল শিপিং চুক্তিতে পণ্য পরিবহনের জন্য কী পরিমাণ মাশুল বা ফি নেয়া হবে— সে বিষয়ে কোনো কিছু উল্লে­খ নেই।
 
কানেক্টিভিটি বাড়াতে ভারতের সঙ্গে সই হওয়া চুক্তিগুলোর শর্তে যে অস্পষ্টতা এখনও বিদ্যমান তা অবিলম্বে সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সরকারের উচিত হবে শর্তগুলো পরিষ্কার করে চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া। কানেক্টিভিটি বাড়ালে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ আপনাআপনি কমে যাবে। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে স্বাভাবিকভাবে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দ্বি-পক্ষীয় বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় স্থলপথে। উপকূলীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে। ভারত কিংবা এ অঞ্চলের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ প্রশ্নে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার হবে। ভারত বাংলাদেশকে নতুন যে ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে।
 
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেই কানেক্টিভিটি কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে ভুটান ও নেপালের সঙ্গেও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভুটান ও নেপালে বাংলাদেশের পণ্যসামগ্রীর বিশাল বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কানেক্টিভিটির মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব। এছাড়া মায়ানমারের সঙ্গেও কানেক্টিভিটি গড়ে তোলার মাধ্যমে দু’দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ অনেকগুণ বাড়ানো যেতে পারে।
 
ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে চার দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মোটরযান চুক্তি স্বাক্ষরের পর আমরা এখন অনেকটাই আশাবাদী হতে পারি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের ব্যাপারে। এর আগে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত নৌ ট্রানজিট ও বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত চুক্তিগুলোও বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে। এসব চুক্তি কার্যকর হলে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।