বিগত ঈদের ন্যায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে এমন দেড় হাজার কারখানার তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সাব কন্ট্রাকটিং করে এমন ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাই মূলত এ তালিকায় রয়েছে। শিল্পাঞ্চল পুলিশ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এসব কারখানাকে চিহ্নিত করেছে।
ঈদের আগে এসব কারখানাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে। সরকারের নির্দেশে ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যে বিজিএমইএ ১৫টি আলাদা মনিটরিং টিম গঠন করেছে। ঈদের আগে সম্ভাব্য শ্রম অসন্তোষ এড়াতে শিল্পাঞ্চল পুলিশও নজরদারি করছে। এছাড়া সাভারসহ শিল্পাঞ্চল এলাকায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে।
বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি এস এম মান্নান কচি ইত্তেফাককে বলেন, কারখানা নজরদারির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সংগঠনের পরিচালকদের নেতৃত্বে আলাদা টিম গঠন করা হয়েছে। প্রতিবছর ঘুরে ফিরে এসব কারখানাই সঙ্কটের মধ্যে থাকে। তবে এসব কারখানার মধ্যে একশ’ কারখানায় আমাদের মূল নজরদারি থাকবে।
এর বাইরে বিজিএমইএ’র সদস্য নয়, এমন প্রায় ৮শ’ কারখানা রয়েছে। ঈদের আগে এসব কারখানাতেও বেতন-বোনাস নিয়ে ঝামেলা হয়। বিজিএমইএ’র নেতারা মনে করছেন, ঈদের আগে ওই সব কারখানায় অসন্তোষ হলে ওই দায়ও বিজিএমইএ’র ঘাড়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে ওই সব কারখানায় সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বিশেষ নজর দেয়ার দাবি তাদের।
বিজিএমইএ’র একজন ঊর্ধ্বতন নেতা বলেন, ঈদের আগে পাওনা পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও আমাদের চেষ্টা থাকবে সব কারখানার পাওনা পরিশোধের জন্য। তবে এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।
অবশ্য শ্রমিক নেতারা বলছেন, ঈদের ঠিক আগে এসে বেশকিছু কারখানা বেতন-বোনাস নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে উত্সব বোনাস নিয়েও বৈষম্য সৃষ্টি করে। এবার এমন পরিস্থিতি হলে শ্রম অসন্তোষের আশংকা রয়েছে।
মূল বেতনের বাইরে উত্সব ভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে অতীতে বেশ কিছু কারখানায় শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রম আইনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন কথা না থাকায় এটি নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে। কোন কারখানা শ্রমিকদের মূল বেতনের সমান বোনাস দিলেও কোন কোন কারখানা কম দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিল্স) সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা উচিত ছিল। এটি কমপক্ষে মূল বেতনের সমানই হওয়া উচিত। এছাড়া এ বোনাসের অর্থ ঈদের অন্তত ১৫ দিন আগে দেয়া উচিত। এ বিষয়ে বিজিএমইএ এগিয়ে আসতে পারে। তবে এসব বৈষম্য অতীতের চেয়ে কমে এসেছে।
ঈদের আগে শ্রমিকদের যথাসময়ে বেতন-বোনাস নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দফায় দফায় বৈঠক করেছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক ও শিল্পাঞ্চল পুলিশের সঙ্গে গার্মেন্টস মালিকদের প্রতিনিধিদের আলাদা বৈঠক হয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠক থেকে যথাসময়ে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করে কারখানা বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বকেয়া পাওনার দাবিতে বিজিএমইএ ভবনের সামনে প্রায়ই শ্রমিকদের জটলা চোখে পড়ে। বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গাজীপুরের টঙ্গীতে সুজন অ্যাপারেল নামে একটি কারখানা শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। কারখানার মালিক ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে ওই কারখানার সামনে শ্রমিকরা একাধিকবার বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারখানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বিজিএমইতে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
ঈদের আগে যাতে কোনো কারখানা শ্রমিকদের বেতন বকেয়া রেখে বন্ধ না করে সে জন্যও কারখানা মালিকদের বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বেতন পরিশোধ করতে গার্মেন্টসগুলোকে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি মনে করেন, ঈদের আগে দেড় শতাধিক কারখানা পাওনা পরিশোধের ঝুঁকিতে রয়েছে। আবার বোনাস দেয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য আছে। এসব কারণে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা একটি চক্র এ ধরনের ইস্যুর অপেক্ষায় থাকে। প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওনা পরিশোধে নির্দেশ দেয়া হলেও এবার এখন পর্যন্ত এমন নির্দেশ না দেয়ায়ও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সিসিটিভির আওতায় আসছে শিল্পাঞ্চল
শিল্প অধ্যুষিত সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকার শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে গতকালও বিজিএমইএতে বৈঠক হয়েছে। ওইসব এলাকার শ্রমিকদের বেতন ১০ জুলাইয়ের মধ্যে এবং উত্সব ভাতা ১৪ জুলাইয়ের মধ্যে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া সাভারের আশুলিয়া, বাইপাইল, জিরাবো এবং গাজীপুরের কিছু এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গার্মেন্টস মালিকরাও এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
বৈঠকে বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী, সাভারের সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান এবং শিল্পাঞ্চল পুলিশের মহাপরিচালক আব্দুস সালামসহ সাভার এলাকার বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক উপস্থিত ছিলেন।
আব্দুস সালাম মুর্শেদী ইত্তেফাককে বলেন, ‘অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের নিয়ম মানতে গিয়ে কারখানার দরজা বন্ধ রাখা যাচ্ছে না। ফলে অসন্তোষ এবং লুটতরাজ ঠেকাতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হচ্ছে। তবে এটি কবে থেকে শুরু হচ্ছে তা এখনো ঠিক হয়নি।’