বিশ্বের তিন মহাদেশের তিন দেশে জঙ্গি হামলার পর ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে দেশগুলোর নিরাপত্তা বাহিনী। অনেককেই ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে তিউনিসিয়ায়। এছাড়া দেশটিতে জঙ্গি হামলায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ৮০ টি মসজিদ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হাবিব এসিদ। এদিকে ফ্রান্স এবং কুয়েতে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। -খবর বিবিসি, রয়টার্স ও আল-জাজিরার।
হামলার পরই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে আরব বসন্তের সূতিকাগার বলে পরিচিত তিউনিশিয়া। পর্যটকদের দর্শনীয় জায়গাগুলোতে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। তিউনিশিয়ার প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসবাদকে সংগঠিত করতে কিছু মসজিদ অব্যাহতভাবে তাদের উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানান, নিহতদের বেশিরভাগই যুক্তরাজ্যের নাগরিক। ব্রিটেনের ৮ জন, বেলজিয়ামের একজন এবং জার্মানির এবং আয়াল্যান্ডের একজনের মৃতদেহ চিহ্নিত করা গেছে। এছাড়া ফ্রান্সের নাগরিকও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জঙ্গি হামলার পর বড় ধরনের অভিযানের নির্দেশ দেন। পর্যটন স্পটগুলোতে সেনাবাহিনী নিয়োগ দেয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের বাইরে যারা কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, দেশ এবং সরকার এখন হুমকির সম্মুখীন।
তিউনিশিয়ার অর্থনীতি পর্যটন শিল্পের উপরে নির্ভরশীল। তিউনিশিয়ার মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন জিডিপি’র প্রায় ১৫.২ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে। গত বছর তিউনিসিয়ায় ঘুরতে এসেছিলেন প্রায় ৬১ লাখ পর্যটক। চার লক্ষ ৭৩ হাজার মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। ফলে শুক্রবার সুসে’র হা?মলার পরেই দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা নেয় তিউনিসিয়া সরকার। প্রথমেই নানা দর্শনীয় জায়গায় সেনা মোতায়েন করা হয়। চলতি বছরের মার্চে রাজধানী তিউনিসের বারদো মিউজিয়ামে হামলা চালিয়েছিল সন্ত্রাসবাদীরা। সেই হামলায় ২২ জন পর্যটক নিহত হয়েছিলেন। তাই এই কড়াকড়িও পর্যটকদের বড় অংশকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। পর্যটকদের বড় অংশ তিউনিসিয়া ছাড়তে শুরু করেছেন। শুক্রবারের হামলায় তিউনিসিয়ায় মৃতের সংখ্যা ৩৮ জনে পৌঁছেছে। প্রায় একইভাবে সক্রিয় হয়েছে কুয়েত। দেশটি গতকাল শনিবার শোক পালন করেছে। মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহতদের জানাযায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয়। ফ্রান্সও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করেছে। একইসঙ্গে ঘটনার তদন্তও শুরু করেছে সরকার।
ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এরই পাশাপাশি, কুয়েতের ইমাম সাদিক মসজিদে হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৭। আহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গিয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আইএস জানিয়েছে, সৌদি আরব, ইয়েমেনের পরে শিয়া মসজিদের উপরে এটা তাদের তৃতীয় আক্রমণ। কুয়েতে সুন্নিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও বেশ বড় অংশের শিয়ার বাস। শিয়াদের উপরে আবার আক্রমণ হবে বলেও আইএস হুমকি দিয়েছে। ঘটনার পরে কুয়েত সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করেছে। ফ্রান্সের নিরাপত্তা বাহিনী সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। যে কারখানায় হামলা করা হয় সেখানকার কর্মীদেরও ওপর নজরদারি শুরু হয়েছে। ওই কারখানার কেউ এর সঙ্গে জড়িত আছে কিনা সেটি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, শুক্রবার ফ্রান্সের লিয়নের প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সেন্ট কোয়েটিন ফ্যালাভিয়ারে ইউএস মালিকানাধীন একটি কারখানায় বিস্ফোরণে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এছাড়া এতে দু’ব্যক্তি আহত হন।
শেখ হাসিনার নিন্দা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্রান্সের লিয়ন শহরের কাছে একটি গ্যাস কারখানায় সন্ত্রাসী হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। গতকাল ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদকে পাঠানো এক বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী বাহিনী পুনরায় যে কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে তা সভ্য মানবতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবশ্যই সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হবে।’ বার্তায় প্রধানমন্ত্রী পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের মানুষ সন্ত্রাস এবং যে কোন প্রকার জঙ্গি উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে ফ্রান্সের বন্ধুপ্রতীম জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আপনি এবং ফরাসী জনগণ এবং বিশেষ করে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতদের নিকট ও আপনজনদের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সহানুভূতি জানাচ্ছি।’ শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারের জিরো টলারেন্সের কঠোর নীতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুয়েত নগরীর একটি মসজিদে বোমা হামলার নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কুয়েত এবং বিশ্ব সমপ্রদায়ের সঙ্গে একসাথে কাজ করতে তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী শেখ জাবের আল-মুবারক আল হামাদ আল সাবাহ’র কাছে গতকাল পাঠানো এক বার্তায় কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী এবং বোমা হামলায় হতাহতদের পরিবারের সদস্যদের ও সে দেশের ভ্রাতৃপ্রতিম সকল জনগণের প্রতি তাঁর গভীর শোক ও আন্তরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। বার্তায় তিনি এই হামলার ঘটনাকে খুবই দুঃখজনক ও উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করেন। এই জঘন্য হামলায় ২৭ জন নিহত এবং ২৭৭ জন আহত হয়। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষে কুয়েতের আল সাবার জেলায় ইমাম আল সাদিক মসজিদে এই বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। শেখ হাসিনা বার্তায় কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী শেখ জাবের আল মুবারক আল হামাদ আল সাবাহ’র সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং ভ্রাতৃপ্রতিম কুয়েতি জনগণের সুখ ও অব্যাহত শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।