বে ড়া নো

শত বছর পুরোনো জমিদার বাড়ি

 

n  সুমন্ত গুপ্ত

 

ঐতিহাসিক কোনো স্থান এবং তার ইতিহাস জানার প্রতি আগ্রহ আমার সেই ছোটবেলা থেকে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা জমিদার বাড়িগুলোর প্রতি দারুণ আগ্রহ বোধ করি। তবে অনেক দিন ধরে কোনো জমিদার বাড়িতে ঘুরতে যাওয়া হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সিলেটের সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ির নাম চোখে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই আমার গ্রুপের ছেলে নিলয়কে ফোন দিলাম। ওর সঙ্গে প্ল্যান করলাম, আসছে শুক্রবার বেড়িয়ে পড়ব সুনামগঞ্জের গৌরারং জমিদার বাড়ি দেখতে।

প্রথমে আমাদের যেতে হবে চৌহাট্টাতে। সেখান থেকে কার অথবা মাইক্রো করে সুনামগঞ্জ শহরে যেতে হবে। চৌহাট্টাতে গিয়ে কারের জন্য অপেক্ষা করছি আমি, মা ও নিলয়। শেষ পর্যন্ত একজন ড্রাইভারের দেখা পেলাম। রওনা দিলাম সুনামগঞ্জের উদ্দেশে। সিলেট শহর থেকে লামাকাজি, গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার, পাগলা বাজার ধরে আমাদের চার চাকার গাড়ি চলছে। যেতে যেতে মনে হলো পৃথিবীতে সবুজ ছাড়া আর কোনো রং নেই! আগের রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, গাছের পাতায় জল তার সাক্ষী। শান্তিগঞ্জ বাজার পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সুনামগঞ্জ শহরে। এদিকে পেটে চলছে রাম রাবণের যুদ্ধ! কোথাও খোঁজাখুঁজি না করে সরাসরি সাইনবোর্ডবিহীন এক খাবারের দোকানে ঢুকে পড়লাম। দেখলাম গরম গরম মিষ্টি সিরার থেকে সবেমাত্র তোলা হয়েছে পরিবেশনের জন্য। রুটি আর গরম মিষ্টি দিয়ে সেরে নিলাম পেটপূজা। দোকানের একজনের কাছে জানতে চাইলাম, গৌরারং জমিদার বাড়ি কিভাবে যাব? বললেন, রিকশা নিয়ে চলে যান নতুন ব্রিজে। সেখান থেকে সিএনজি করে যেতে পারবেন।

স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম জামিদার বাড়িতে। জমিদার বাড়ির ফটক থেকে ভিতরের দিকে প্রবেশ করলাম। পুরোনো ভবনের প্রতিটি স্থানে আছে অসাধারণ শৈল্পিক কাজ। অনেক বড় এলাকা নিয়ে বাড়িটি। দেখা হলো ওই এলাকার এক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে। তার কাছে এই বাড়ির ইতিহাস জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, দু শ বছর আগে জমিদার রাজেন্দ্র কুমার চৌধুরী ও জমিদার রাকেশ রঞ্জন চৌধুরীর হাতে এই জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়। ত্রিশ একর জমির ওপর তারা এই জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন। তবে তাদের সময় এখানে জমিদারি চালু হলেও মূলত জমিদার রাম গোবিন্দ চৌধুরীর সময়ে এই জমিদার বাড়িটি বিস্তৃতি লাভ করে। তিনিই ছিলেন এই এলাকার প্রতাপশালী জমিদার। তার আমলে জমিদার বংশধর ব্যতীত অন্য কেউ এখানে জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটতে পারত না। এই জমিদার বাড়িটিতে আলাদা আলাদা ছয়টি ভবন ও রংমহল, অন্দরমহল, সিংহাসন ও জলসা ঘর রয়েছে।

তিনি আরও বললেন, প্রভাবশালী এই জমিদার বাড়িটির জৌলুসে ভাটা পড়ে ৪৭ সালের দেশভাগের সময়। পরে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এই প্রভাবশালী জমিদার বাড়িটিও হারিয়ে ফেলে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও জৌলুস। এর পরবর্তী সময়টা কেবলই ইতিহাস! মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জমিদার বাড়িটি পাকবাহিনী কর্তৃক প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। এর আগে আঠারো শতকের কোনো একসময় প্রচণ্ড ভূমিকম্পে জমিদার বাড়িটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভবন ধসে বাড়িটির তত্কালীন জমিদারের এক ভাই নিহত হন। কালক্রমে জমিদার উত্তরসূরিরা অন্যত্র চলে গেলে বাড়িটি অরক্ষিত ও ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠে।

এ জমিদার বাড়িটির সামনে দিয়ে সাবলীল গতিতে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর সবুজ ও স্বচ্ছ জলধারা। পিছনে সুবিশাল হাওর। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর সবুজ। দখিনা বাতাসে এক অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতিতে বিমুগ্ধ হলাম। একটু সামনেই আছে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন ঘুরতে। কারুকাজ খচিত অন্দরমহল ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীর কারণেই জমিদার বাড়িটি এখন ভ্রমণপিপাসুদের নজর কেড়েছে। আর এই ভরা বর্ষায় থইথই জলের মধ্যে মনে হয় এ যেন সমুদ্রে ভাসমান কোনো রাজপ্রাসাদ। অনুপম নির্মাণশৈলীর কারণে এ জমিদার বাড়িকে হাওর রাজ্যের রাজমহল হিসেবেই আখ্যায়িত করেন স্থানীয়রা। 

যাবেন কীভাবে

সরাসরি ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ ৫৫০ টাকা বাস ভাড়া। এনা, শ্যামলী, মামুন কোম্পানির বাস যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে প্রথমে আপনাকে ঢাকা থেকে সিলেট আসতে হবে ট্রেনে। তারপর সিলেট থেকে গাড়ি করে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে সুনামগঞ্জ নতুন ব্রিজ। তারপর ব্রিজ থেকে সিএনজি করে জমিদার বাড়ি। ভাড়া ২৫ টাকা জনপ্রতি।