বি শ্বে র ঐ তি হ্য বা হী

চিরতরুণ দৈনিক

দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন

‘দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন’ হলো ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপানি দৈনিক পত্রিকা। জাপানি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক ‘আসাহি শিমবুন’, ‘মাইনিছিশিমবুন’, ‘সানক্যেই শিমবুন’সহ অন্যান্য পত্রিকার মধ্যে দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন বিশ্বের একটি সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক। এটি জাপানের সবচেয়ে প্রভাবশালী দৈনিক।

দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া

শুভসূচনা মুম্বাইয়ে ১৮৩৮ সালের ৩ নভেম্বর। একটা-দুইটা বছর নয়, দীর্ঘ ১৭৬ বছর পার করে ফেললো এই ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’। ১৭৬ বছর ধরে টানা একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে চলছে এমন নজির ভারতে নেই। দীর্ঘ সময় ধরে ‘ভারতকথা’ শুনিয়ে চলছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, তা সে পরাধীন ভারতের হোক কিংবা স্বাধীন ভারতের।

দৈনিক ইত্তেফাক

১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট ‘সাপ্তাহিক ইত্তেফাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রথম প্রকশিত হয়। এরপর ঐতিহাসিক কালক্রমে মানিক মিয়ার তেজস্বী লেখনীর প্রেরণায় বাঙালি জাতি যে ঐক্যবদ্ধের চেতনায় জাগ্রত হয়েছিল, তার পথ ধরেই ৭১-এ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের মাটিতে সংগঠিত হয়েছিল মুক্তির মহাজনযুদ্ধ। এলো স্বপ্নের স্বাধীনতা। একাত্তরের ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর জ্বালিয়ে দেয়া ছাইভস্মের ওপর দাঁড়িয়ে পত্রিকাটি পুনরায় ২১ মে থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। তারপর ১৯৭৫ সালের ৭ জুন তত্কালীন সরকারের ব্যবস্থাপনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে থাকে। পরে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট পত্রিকাটির মালিকানা মানিক মিয়ার উত্তরসূরিরা ফিরে পায়। আজও এদেশের প্রধান দৈনিক হিসেবে সমুজ্জ্বল।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

১৮৭৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে অবস্থিত হওয়ায় মার্কিন রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে এই পত্রিকাটির যথেষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত পত্রিকা না হলেও ওয়াশিংটন পোস্ট-কে একটি ‘প্রামাণিক সংবাদপত্র’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

যুক্তরাজ্যের শতবর্ষব্যাপী বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড’-এর সম্রাট ছিলেন রুপার্ট মারডক। রুপার্ট মারডকের মিডিয়া সংস্থা ‘নিউজ লিমিটেড’ (পরবর্তীতে নিউজ ইন্টারন্যাশনাল) ১৯৬৯ সালে একবছর ব্যাপী তিক্ত লড়াই শেষে এই শতবর্ষব্যাপী নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড পত্রিকাটি কিনে নেয়। সর্বপ্রথম ১৮৪৩ সালের ১ অক্টোবর এই পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ। তখন এটি ট্যাবলয়েড আকারে ছাপা হতো না, এটি ছিল একটি ব্রডশিট পত্রিকা। এর প্রকাশক ছিলেন জন ব্রাউন বেল। মাঝে ১৮৯১ সালে লেসলেস কার নামে একজন ব্যক্তি পত্রিকাটি কিনে নেয়। সবশেষে এর আধিপত্য রচিত হয় রুপার্ট মারডকের হাত ধরেই। ১৯৮৪ সাল হতে এর রূপান্তর হয় ট্যাবলয়েড আকারে। এ সময় হতে কিন্তু নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড গণ্যমান্য ব্যক্তিদের গোপন খবর ছাপানোয় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। মূলত যৌন কেলেঙ্কারির খবর ছাপানোর ব্যাপারে এর আদিখ্যেতার কারণে এর সুনির্দিষ্ট ডাকনামও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দ্রুত পরিচিতি ও সর্বাধিক বিক্রিত পত্রিকার তালিকায় এর স্থান হয় এবং প্রচার সংখ্যা ১২ হাজার হয়ে ওঠে, যা সেই সময়কার জন্য বিশাল। তখন পত্রিকাটির মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয় প্রতি কপি দেড় পাউন্ড হিসেবে। একটা সময় ব্রিটিশ সরকার সংবাদপত্রের ওপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করায় অন্যান্য পত্রিকা তাদের মূল্য কমিয়ে দিলেও নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড তার মূল্যমান আগের মতোই অপরিবর্তিত রেখে দেয়। বিংশ শতাব্দিতে এর জনপ্রিয়তা সর্বাধিক হয়, যার প্রমাণ ৯০ লাখ কপি। এর আধিপত্য বিস্তারকারী রুপার্ট মারডক, যার বয়স এখন ৮০, চীনা স্ত্রী ওয়েনদি দেং ও ছয় পুত্র-কন্যা নিয়ে যার সংসার, যার সম্পদের পরিমাণ ৭৬০ কোটি মার্কিন ডলার এবং যার মিডিয়া সাম্রাজ্য অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা এমনকি চীন পর্যন্ত বিস্তৃত। পর্দার পেছন থেকে যিনি রাজনীতিতেও কলকাঠি নাড়িয়েছেন প্রধানত অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনে, সেই তিনি এখন অনেকটা অসহায়। তার সাম্রাজ্য আছে, কিন্তু প্রতিপত্তি ক্ষীয়মান। মঞ্চে আছেন, কিন্তু নায়ক নন, ভিলেন হয়ে। তার ফোনে আড়িপাতার জালে পড়েনি কে? প্রিন্স উইলিয়াম থেকে শুরু করে অভিনেতা হিউ গ্রান্ট, রণক্ষেত্রে নিহত ব্রিটিশ সেনাদের পরিবার থেকে খুন হয়ে যাওয়া স্কুলছাত্রী পর্যন্ত তালিকা অনন্ত। এমনকি তথ্য বের করার জন্য পুলিশকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ কার বিরুদ্ধে? অভিযোগ ট্যাবলয়েডটির প্রাক্তন সম্পাদক অ্যান্ডি কোলসন, গ্রেপ্তার হয়েছেন রাজপরিবারের অন্দরমহলে আড়িপাতায় ঝানু সাংবাদিক ক্লাইভ গুডম্যান। এই আড়িপাতার কেলেঙ্কারিকে এরইমধ্যেই অনেকে মারডকের ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ হিসেবে বর্ণনা করতে শুরু করেছেন এবং পত্রিকাটির খেসারত ১৬৮ বছরের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকার শেষকৃত্যানুষ্ঠান আয়োজন।

 

ভারতের সময়

 

‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ ভারতের ইংরেজি ভাষার দৈনিক সংবাদপত্র, যা ২০০৮ সালে ঘোষণা করে যে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রিত এই পত্রিকাটি ৩.১৪ মিলিয়ন পাঠক পড়ে থাকে। বর্তমানে এটি বিশ্বের অধিক বিক্রিত পত্রিকার তৃতীয় স্থানের মর্যাদা লাভ করেছে। ২০১২ সালে ভারতীয় পাঠক জরিপের এক হিসেব অনুযায়ী দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া হলো বহুল পঠিত ভারতের ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র এবং এর পাঠক সংখ্যা ৭.৬৩ মিলিয়ন। পত্রিকাটি ‘বেনেট’, ‘কোলম্যান এন্ড কোম্পানি লিমিটেড’ মালিকানাধীন এবং প্রকাশিত।

এই ভারতের সময়ের সূচনা মুম্বাইয়ে ১৮৩৮ সালের ৩ নভেম্বর। একটা-দুইটা বছর নয়, দীর্ঘ ১৭৬ বছর পার করে ফেললো এই টাইমস অফ ইন্ডিয়া। ১৭৬ বছর ধরে টানা একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়ে চলছে এমন নজির ভারতে নেই। দীর্ঘ সময় ধরে ‘ভারতকথা’ শুনিয়ে চলছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া, তা সে পরাধীন ভারতের হোক কিংবা স্বাধীন ভারতের। বিরাট দেশের নানা ইতিহাসের সাক্ষী থেকে তার সত্যনিষ্ঠ বর্ণনা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেছে এই সংবাদপত্র। পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণ, দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনের নানা পরিবর্তন সহজ-সরল কথায় তুলে ধরেছে এই পত্রিকা। দেশটির যেসব অংশ অবহেলিত, যেসব মানুষ অনালোকিত তাদের কথাও বারবার উঠে এসেছে এই পাতায়। এমনকি একেবারে গোড়ার দিকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ গঠনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল এই ভারতের সময়-ই। ভারতীয় জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর জাতীয় মঞ্চে প্রবেশ করার পর তার প্রতিটি পদক্ষেপ এই সংবাদপত্র বিশ্বস্ততার সাথে অনুসরণ করেছে। এই কাগজ লিখেছিল সেই দিনটির কথাও যেদিন গান্ধীজি ডান্ডি পৌঁছে একমুঠো লবণ হাতে নিয়ে এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটির ওপর অন্যায্য করের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের ভগত্ সিং, শুকদেব ও রাজগুরু এই বিপ্লবী ত্রয়ীর বীরগাঁথা এবং তাদের বিচারের কথা রোজই ছাপা হতো। দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার পুরোনো পাতা উল্টে যাওয়া মানেই ইতিহাসের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়া! আজ টাইমস অফ ইন্ডিয়া এমনই একটি আধুনিক মাল্টিমিডিয়া সংস্থা যা উদার অর্থনীতি, বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সমর্থন করে। এর ইন্টারনেট সংস্করণ আজ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইট। এটি এখন মোবাইল ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে এবং এই বছরের জানুয়ারিতে এর সম্মিলিত পেজ ভিউ ছিল প্রায় ৫০ কোটি।

বাংলাদেশ এবং দৈনিক ইত্তেফাক

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী-মুসলিম লীগ নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করে পাক শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। তত্কালীন সমস্ত পত্র-পত্রিকা পাক শাসকের সমর্থক ছিল। ফলে নবগঠিত আওয়ামী-মুসলিম লীগের কোনো মুখপাত্র ছিল না। তাই বাংলার জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট সাপ্তাহিক ইত্তেফাক নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার সম্পাদনায় প্রথম প্রকশিত হয়। পত্রিকাটি ৯নং হাটখোলা রোডস্থ প্যারামাউন্টন প্রেসে মুদ্রিত এবং ৯৪নং নবাবপুর রোড থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। আওয়ামী-মুসলিম লীগের নেতাকর্মীরা পত্রিকাটি প্রকাশনা, প্রচার ও বিপণনে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ইত্তেফাক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগ্রত ধারক-বাহকে পরিণত হয়। মানিক মিয়াসহ দেশের বুদ্ধিসমাজের তীক্ষ ক্ষুরধার লেখনীতে বাঙালির মোহভঙ্গ হয়। বুঝতে পারে পাক চক্র বাঙালি জাতির অস্তিত্বকেই মুছে দিতে চায়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে যে ছাত্র হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত হয়, তা ২২ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাকে প্রকাশ পেলে সারাদেশে আন্দোলনের অনল প্রবাহের সৃষ্টি করে। গণমানুষ নব চেতনা ও জাগরণে জাগ্রত হয়। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর ইত্তেফাক দৈনিক পত্রিকা রূপে আত্মপ্রকাশ করে। মানিক মিয়ার লিখিত ‘মুসাফির’ নামক কলাম পূর্ব বাংলার জনগণকে দীপ্তভাবে পাক শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে জাগ্রত করে। শেখ মুজিবের সাংগঠনিক শক্তি, মানিক মিয়ার মসি আর শহীদ সাহেবের প্রজ্ঞায় ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় সূচিত হয়। ২১ দফা ভিত্তিক এ নির্বাচনে মানিক মিয়ার মসি ছিল মরণাস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বর্জন করে আওয়ামীলীগ সর্বজননন্দিত অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এক্ষেত্রে মানিক মিয়ার সাম্প্রদায়িক চেতনামুক্ত শক্তিশালী তেজস্বী লেখনী মূখ্য ভূমিকা পালন করে। মানিক মিয়া ছিলেন বঙ্গবন্ধুর উপদেষ্টা ও চালিকাশক্তি, আর শহীদ সাহেব ছিলেন ছায়াতরু। আইয়ুব সামরিক শাসনামলে মানিক মিয়া ‘মুসাফির’ নামে তীব্র প্রতিবাদের ভাষায় দৃঢ় হস্তে কলম ধরেন। ফলে ১৯৫৯ সালের সামরিক আইন ভঙ্গের অজুহাতে মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি শহীদ সাহেবকে করাচিতে গ্রেফতার করা হলে পূর্ব বাংলায় তীব্র ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ফলে ৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব ও মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালের ৮ জুন সামরিক শাসন প্রত্যাহার হলে শেখ মুজিব, মানিক মিয়াসহ অনেক রাজবন্দি মুক্তি পান। শহীদ সাহেব ১৯৬২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান এবং গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলনে এনডিএফ গঠন করেন। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সাহেব মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা প্রতিরোধে মানিক মিয়া তার পত্রিকার মাধ্যমে ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ শীর্ষক ইস্তেহার প্রচার করেন এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। মোনায়েম খান দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির নেতা শেখ মুজিব, তাইজুদ্দিনসহ অনেককে গ্রেফতার করেন। মানিক মিয়ার শাণিত লেখনী আর শেখ মুজিবের দুর্দমনীয় সাংগঠনিক শক্তি, তেজময় উক্তিতে বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদী চেতনা তখন তুঙ্গে। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু লাহোরে ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। আর এই ৬ দফা আন্দোলনকে বিকশিত করতে মানিক মিয়ার কলমের প্রভাবে পূর্ব বাংলা প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়। ১৯৬৬ সালের ১৫ জুন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়।

১৬ জুন মোনায়েম খান দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশনা বন্ধ করে দেন এবং প্রেস বাজেয়াপ্ত করেন। মানিক মিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা আইনে বিচার শুরু হয়। মানিক মিয়া আইয়ূব-মোনায়েম চক্রের কাছে অবনত না হয়ে ৬ দফা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ১৯৬৬ সালের ২৯ মার্চ সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে শেখ মুজিবসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।

২ বছর ৭ মাস দৈনিক ইত্তেফাক বন্ধ থাকার পর ১৯৬৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যুত্থানকালে ইত্তেফাক মুক্তি পেয়ে আবার ফিরে আসে বাংলার গণমানুষের কাছে। ১৯৬৯ সালের ১ জুন পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডি অবস্থানকালে মানিক মিয়া হঠাত্ মৃত্যুবরণ করেন। উপমহাদেশের সাংবাদিকতার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক-বাহক ও মসি মহাযোদ্ধার ছন্দময় জীবনের অবসান হয়।

মানিক মিয়ার তেজস্বী লেখনীর প্রেরণায় বাঙালি জাতি যে ঐক্যবদ্ধের চেতনায় জাগ্রত হয়েছিল, তার পথ ধরেই ৭১-এ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এদেশের মাটিতে সংগঠিত হয়েছিল মুক্তির মহাজনযুদ্ধ। এলো স্বপ্নের স্বাধীনতা। উদয় হলো বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। একাত্তরের ২৫ মার্চ পাক বাহিনীর জ্বালিয়ে দেয়া ছাইভস্মের ওপর দাঁড়িয়ে পত্রিকাটি পুনরায় ২১ মে থেকে প্রকাশিত হতে থাকে। তারপর ১৯৭৫ সালের ৭ জুন তত্কালীন সরকারের ব্যবস্থাপনায় পত্রিকাটি প্রকাশিত হতে থাকে। পরে ১৯৭৫ সালের ২৪ আগস্ট পত্রিকাটির মালিকানা মানিক মিয়ার উত্তরসূরিরা ফিরে পায়। 

প্রকাশ লগ্ন থেকে যে দীপ্ত চেতনার অগ্নিঝঙ্কারে এদেশে অগ্নিযুগ এসেছিল, এনেছিল স্বাধীনতা, এ দেশবাসী এখনও বিশ্বাস করে ইত্তেফাক আজও এদেশের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলবে। দুর্বৃত্তায়ীত রাজনীতি, সমাজনীতি জাতীয় অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদের ভাষায় তার বুকে এঁকে যাবে দীপ্ত দৃঢ় কণ্ঠে কলমের শক্তিতে।

 

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও সর্বাধিক সার্কুলেশন বিশিষ্ট ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা। ১৮৭৭ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে অবস্থিত হওয়ায় মার্কিন রাজনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে এই পত্রিকাটির যথেষ্ট প্রভাব বিদ্যমান। জাতীয় পর্যায়ে প্রকাশিত পত্রিকা না হলেও ওয়াশিংটন পোস্ট-কে একটি ‘প্রামাণিক সংবাদপত্র’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ওয়াশিংটন ডিসি অঞ্চল, এবং ম্যারিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে পত্রিকাটির সংস্করণ বের হয়। ১৯৯১ সালে লিওনার্ড ডাওনি জুনিয়রকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে স্থলাভিষিক্ত করার পর থেকে পত্রিকাটি ২৫ বার পুলিত্জার পুরস্কার জয় করেছে। ২০০৮ সালে এটি ৮টি একক পুলিত্জার পুরস্কার লাভ করে, যা কোনো পত্রিকার এক বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক পুলিত্জার জয়ের উদাহরণ! যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া জগতে প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্ট গত আট দশকে বহু তারকা সাংবাদিকের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৯৭৪ সালে একবারই প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের ঘটনা ঘটে এবং দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাই সর্বপ্রথম এই ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির সংবাদ প্রকাশ করেছিল। মার্কিন সমাজে তিন প্রজন্মের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। ১৯৯৩ সালে পত্রিকাটির গ্রাহক সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ। যদিও বৈরি বাস্তবতায় এর গ্রাহক সংখ্যা বর্তমানে কমে এসেছে। সম্প্রতি এর মালিকানা ‘গ্রাহাম পরিবার’ থেকে রদবদল হয়ে অনলাইন প্রতিষ্ঠান ‘আমাজন ডট কম’-এর মালিক জেফরি বেজোসের হাতে রয়েছে।

দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন

দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন হলো ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপানি দৈনিক পত্রিকা। জাপানি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক ‘আসাহি শিমবুন’, ‘মাইনিছি শিমবুন’, ‘সানক্যেই শিমবুন’সহ অন্যান্য পত্রিকার মধ্যে দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন বিশ্বের একটি সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক। সংবাদপত্রটি ওসাকা, টোকিও, ফুকুকা ছাড়া জাপানের অন্যান্য শহরেও প্রকাশিত হয়। জাপানের গণমাধ্যম জগতের ‘নক্ষত্র’ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠান ‘ইয়োমিউরি’ গ্রুপ থেকে প্রকাশিত হয় দ্য ইয়োমিউরি শিমবুন। বর্তমানে এর প্রধান দায়িত্বে রয়েছে ইয়োচি ফুনাবাসি। ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে সকাল-সন্ধ্যা মিলিয়ে এক কোটির ওপরে এই সংবাদপত্র জনগণের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। সর্বশেষ হিসেব অনুযায়ী এর প্রকাশ সংখ্যা বর্তমানে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ। এর একটি উলেখযোগ্য দিক হলো পত্রিকাটি দিনে দু’বার ছাপানো হয়। ১৯৪৮ সালে পত্রিকাটি ‘ইয়োমিউরি’ ঘোষণা করে। দীর্ঘ এ পথচলায় অনেক পত্রিকা  ঘোষণা করছে এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের সদস্য ইয়োমিউরি শিমবুন।

এমনকি জাপানের অন্যতম অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এ পত্রিকাটি। ১৯২৪ সালে শোরিকি মাতসুতোরো কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই পত্রিকাটির মোড় ঘুরিয়ে ফেলেন চমকপ্রদ নিউজ কভারেজ, পুরো পৃষ্ঠাব্যাপী রেডিও গাইড যুক্ত করে।