সব ক্ষমতার কেন্দ্রে মিন্টু মামলায় ন্যুব্জ বিএনপি

সাইদুল করিম মিন্টু। জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র। ঝিনাইদহ জেলার আওয়ামী লীগের সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় তাকে ঘিরে। ঝিনাইদহ সদর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতেছেন। আর নির্বাচনে পরাজিত হয়ে শফিকুল ইসলাম অপু একটু সাইডে পড়ে গেছেন। ঝিনাইদহ জেলার বর্তমান সভাপতি এক নম্বর আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হাই একটু লো-প্রোফাইলে থাকতেই পছন্দ করেন। ফলে সবকিছু একাই নিয়ন্ত্রণ করছেন সাইদুল করিম মিন্টু। ঠিক উল্টো অবস্থা বিএনপির। সরকার বিরোধী আন্দোলন ফ্লপ হওয়ায় বিএনপি সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছে না। পাশাপাশি রয়েছে মামলার ভার। একজন বিএনপি নেতা আক্ষেপ করে বললেন, মামলার ভারে আমরা এখন ন্যুব্জ।

 
গত ২৫ মার্চ বর্ণাঢ্য আয়োজনে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলন শেষে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুল উল আলম হানিফ ঝিনাইদহ জেলার সভাপতি হিসাবে আব্দুল হাই, সাধারণ সম্পাদক হিসাবে সাইদুল করিম মিন্টু এবং সহ-সভাপতি হিসেবে এ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান ও  শফিকুল ইসলাম অপুর নাম ঘোষণা করেন। তিন মাস পার হলেও জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি এখনো ঘোষিত হয়নি। এ নিয়ে দলীয় পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আছে। কাগজে চারজন হলেও মূলত দল চালাচ্ছেন মিন্টু একাই।
 
পৌর মেয়রের কার্যালয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে সাইদুল করিম মিন্টু বলেন, ‘ঝিনাইদহে আমাদের টিকে থাকাই তো কঠিন! এখানকার এমপি সতন্ত্র। সব সময় আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য লেগে আছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান বিএনপির। আমরা তো কোন সুবিধাই পাই না। প্রশাসনের কেউ আমাদের কথা শোনে না। তারা শোনে এমপির কথা। তা না হলে কি ঝিনাইদহ সদর থানার ওসি বিপ্লব কুমার নাথ আমার বিরুদ্ধে থানায় জিডি করতে পারেন।’ অন্য সব অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঝিনাইদহে আমি একটা ফ্যাক্টর। তাই আমাকে ধ্বংস করতে পারলে বিরোধীদেরই তো লাভ। তারাই এই প্রচারণা চালায়।’  
 
একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভিতরে ভিতরে অসন্তোষ থাকলেও দলের পুরানো ও নতুন নেতা কর্মীরা কেউই এসব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। গোপনে মিন্টুর সমালোচনা করলেও কেউ মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নন। দলের  দু’এক জন প্রবীণ নেতা বলেন, ‘ঠিকাদারি ব্যবসা থেকে শুরু করে প্রশাসন— সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন মিন্টু। ভালো-খারাপ সব ধরনের লোকই এখন মিন্টুর পেছনে ঘোরে।
 
এদিকে ঝিনাইদহ-২ আসনের (সদর ও হরিণাকুণ্ডু) রাজনীতিতে সতন্ত্র সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী শক্তি সঞ্চয় করছেন। শিল্পপতি ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর ছেলে তাহজীব সিদ্দিকী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দলের মনোনয়ন না পেয়ে সতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী তাহজীব আলম সিদ্দিকীর পক্ষে কাজ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক এমপি শফিকুল ইসলাম অপুকে পরাজিত করেন। বিজয়ী হওয়ার পর থেকে তার অবস্থান পাকাপোক্ত করতে সচেষ্ট রয়েছেন। আওয়ামী লীগের একটা অংশ তার সঙ্গে আছে। 
 
শুধু জেলা নয়, উপজেলা পর্যায়েও আওয়ামী লীগে গ্রুপিং রয়েছে। হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক মশিউর রহমান জোয়ার্দ্দার আর যুগ্ম আহ্বায়ক আফজাল হোসেন পৃথক গ্রুপ লালন-পালন করছেন। ঝিনাইদহ-৩ আসনের (মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর) বর্তমান এমপি অধ্যক্ষ নবী নেওয়াজের সঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল আজম খান চঞ্চলের সাপে নেউলে সম্পর্ক। সেখানেও সংগঠন দু’টি গ্রুপে বিভক্ত। আগে টেন্ডারসহ যাবতীয় কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন তত্কালীন এমপির ভাইরা। আর এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন বর্তমান এমপির ভাই মইনুল হক। অভিযোগ আছে, পুলিশের কনস্টেবল পদে লোক নিয়োগের জন্য কয়েকজনের কাছ থেকে ৪/৫ লাখ টাকা করে নিয়েছিলেন। পরীক্ষায় তাদের একজনেরও চাকরি হয়নি। এখন টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।
 
এ বিষয়ে এমপি নবী নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ডিও দেয়ার পরও এসপি আমাদের লোক নিয়োগ দেয়নি। অথচ এসপি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছেন, স্থানীয় তিন এমপির পছন্দের ১০ জন করে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। বিষয়টি আমি, আব্দুল হাই ও আনার সাহেব স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে জানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি জানেন।’ ভাইয়ের টাকা নেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারো কাছ থেকে টাকা নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
 
ঝিনাইদহ-৪ আসনেও (কালীগঞ্জ) আওয়ামী লীগ বর্তমান সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার ও সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান শিবিরে বিভক্ত। পুলিশ ও প্রশাসনসহ সব কিছুই আনোয়ারুল আজিমের নিয়ন্ত্রণে। ঝিনাইদহ- ১ আসনেও (শৈলকুপা) দলে দুই ভাগ। এখানে দ্বন্দ্ব বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান মোশারফ শিকদার (সোনা শিকদার) গ্রুপের সঙ্গে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নায়েব আলি জোয়ার্দ্দার গ্রুপের। গ্রাম পর্যায়েও দলে বিভক্তি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন কর্মী খুন হয়েছেন। আহত হয়েছে কয়েক’শ কর্মী।
 
ঝিনাইদহ জেলাতে বর্তমানে বিএনপি’র অবস্থা বড়ই নাজুক। সরকার বিরোধী আন্দোলন ফ্লপ হওয়ার পর দলটি কোমর সোজা করেই দাঁড়াতে পারছে না। একের পর এক মামলা সামলাতেই তারা ব্যস্ত। কর্মীদের অনেকেই এখনও আত্মগোপনে। আবার অনেক নেতা-কর্মী আছেন জেলে। জেলার ছয় থানাতে নাশকতা ও দ্রুত বিচার আইনে বিএনপি জামায়াতের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে  ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত শ’ দু’য়েকের বেশি মামলা হয়েছে। জেলা বিএনপি’র প্রচার সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন দাবি করলেন এসব মামলায় আসামি প্রায় ১৫ হাজার দলীয় নেতা-কর্মী। এর মধ্যে বিএনপি’র প্রায় ৮০ জন নেতা-কর্মী জেলে আছেন। অনেকে আছেন পালিয়ে। 
 
একজন প্রবীণ বিএনপি নেতা বললেন, বিএনপি গঠনের পর থেকে এ রকম দুর্দিনে আর পড়েনি। ২০১৩ সালে আন্দোলন শুরুর পর তারা চাঙ্গা ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি জামায়াতের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারপারসন আন্দোলনের ডাক দেন। নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে থাকায় আন্দোলন ফ্লপ করে। সেই থেকে ঝিনাইদহে বিএনপির আর কাউকে দেখাও যায়নি।
 
অপরদিকে দুর্দিনেও শৈলকুপায় বিএনপি দ্বিধা বিভক্ত। একদিকে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওহাব। আর অপর গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাইকোর্টের আইনজীবী আসাদুজ্জামান আসাদ। দলের নেতা-কর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত। ঝিনাইদহ-৩ আসনেও দল দু’ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপে আছেন সাবেক এমপি শহিদুল ইসলাম মাস্টার। তার প্রতিপক্ষে আছেন জাসাস নেতা মনির খান। ঝিনাইদহ-৪ আসনেও একই অবস্থা। এক গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুজ্জামান বেল্টু। তার প্রতিপক্ষে আছেন হামিদুল ইসলাম হামিদ। তবে সদর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলা এখনো একক নিয়ন্ত্রণে আছে সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মসিউর রহমানের। অবশ্য ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর, কোটচাঁদপুর ও হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় জামায়াত শক্তিশালী। মামলার চাপে ও পুলিশের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে মাঠে নামছে না। তবে গোপনে তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড চলছে বলে জানা গেছে।
 

(আগামীকাল পড়ুন আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন)