ভেজাল খাদ্য রোধে চাই কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ আইন

খাদ্যদ্রব্য উত্পাদন থেকে বাজারজাত করা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই বিষাক্ত ও ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট আইনসমূহের যথাযথ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সময়োপযোগী কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা জরুরি।
 
সোমবার পরিবেশবাদী বাঁচাও আন্দোলন (পবা) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন পরিবেশবাদীরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ফলমূলের ফরমালিন পরীক্ষা, পরীক্ষায় প্রাপ্ত ফলাফল ও বিষাক্ত খাদ্যের বর্তমান অবস্থায় করণীয় তুলে ধরতেই এই আয়োজন।
 
সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, অসচেতন কৃষক, অতি মুনাফালোভী মজুতকারী, পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতা খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ডিডিটি, কীটনাশক, কাপড়ের রং, ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেন ব্যবহার করছে। কৃষিজাত পণ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ও কীটনাশক, ফল, মাছ, শাক-সবজিতে ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করা হচ্ছে।
 
মিষ্টিতে কাপড়ের রং প্রয়োগ করা হয়। শুঁটকি মাছ সংরক্ষণে ডিডিটি ও হেপ্টাক্লোর ব্যবহার করা হয়। ডিডিটি, অ্যালড্রিন, ক্রোমিয়াম, কার্বামেট, আর্সেনিক, সীসা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কৃষিতে কীটনাশকের ব্যাপক অপপ্রয়োগ দেশের জনস্বাস্থ্যকে বিশাল ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
 
কৃষিপণ্যকে কীটনাশক থেকে রক্ষা করা গেলে মানুষ অনেকটা ঝুঁকিমুক্ত হতে পারে। খাদ্যে যেসব রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তাতে হূিপন্ড, পাকস্থলী, কিডনি ও লিভারের রোগ এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক।
 
খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগারে সামপ্রতিককালে ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করা হয়। এতে গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়। ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনাতেই বিষাক্ত বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। চালের ১৩টি নমুনায় মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত বিষক্রিয়া সম্পন্ন আর্সেনিক, পাঁচটি নমুনায় পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় ছিল সীসা ও অন্যান্য ধাতু। লবণেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সীসা পাওয়া গেছে। মুরগির মাংস ও মাছে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব।
 
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্যানুসারে, ঢাকা মহানগরে দেশি ও বিদেশি ফলে ফরমালিনের অবস্থা নিরূপণের লক্ষ্যে পবা ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গত ১০ জুন থেকে ৫ জুলাই পর্যন্ত আম (১৩টি), জাম (৪টি), লিচু (৪টি), আপেল (৯টি), আঙ্গুর (৬টি), মালটা (৬টি), কলা (৩টি), পেয়ারা (৩টি), আনারস (৪টি), জামরুল (২টি), শশা (২টি) ও খেজুর (৫টি) মোট ৬১টি নমুনার ফরমালিন পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব ফল বিভিন্ন বাজার ও এলাকা হতে ক্রয় করে পবা কার্যালয়ে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১০ শতাংশ নমুনায় (জামের ৪টি নমুনার ৩টি, খেজুরের ৫টি নমুনার ২টি এবং জামরুলের ২টি নমুনার ১টিতে) ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
 
এ সময় ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ এবং নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ দ্রুত বাস্তবায়ন, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ রাসায়নিক পদার্থের আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী এবং লেবেল ছাড়া বা মিথ্যা লেবেলের অধীন কীটনাশক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ দেয়া হয়। 
 
সাংবাদিক সম্মেলনে মূল বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনের নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য ফেরদৌস আহমেদ উজ্জল, পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির সভাপতি বুরহান উদ্দিন আহমেদ, ইউনাইটেড পিপলস ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক আলী হাজারী প্রমুখ।