সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগে রয়েছে সুযোগ

‘সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার শুধু সাংবাদিকতাই না; সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের শিক্ষার্থীরা গণসংযোগ, বিজ্ঞাপন এজেন্সি, ফিল্ম মেকিং, ব্যাংকিং এবং শিক্ষকতার মতো বিভিন্ন পেশায় নিজেদের ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।’ - প্রফেসর ড. গোলাম রহমান (যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)’
 
সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগে পড়ার ইচ্ছা আছে অনেকের কিন্তু সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে নেই, এমন শিক্ষার্থী কম নেই। অনেকেই না চাইলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয় নিয়ে পড়তে হয়। তবে এটা নিয়ে মনঃক্ষুন্ন হওয়ার বা ভেঙে পড়ার কিছু নেই। আপনি চাইলেই এই বিষয়ে পড়ে ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন বিভিন্ন সেক্টরে। সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগের কাজের পরিধি আরও বাড়ছে। বাড়ছে নানা মাধ্যমে কাজের সুযোগও। এই পেশায় এখন অনেক সুযোগ। তবে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ম্লান হলেও অচিরে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে। এ ছাড়া এই পেশায়  চাকরির বিস্তর সুযোগ রয়েছে। সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে খুবই বৈচিত্র্যপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী আছেন যারা বৈচিত্র্যের স্বাদ পেতে চান। তাদের জন্য এই পেশা খুবই আকর্ষণীয়। তবে স্নাতক স্তরে সাংবাদিকতায় অনার্স পড়ে শুধু খবরের কাগজ কিংবা নিউজ চ্যানেলে নয়, চাকরি মিলতে পারে বিজ্ঞাপন সংস্থা বা পিআর এজেন্সিতে। এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মফিজুর রহমান।
 
সাধারণভাবে বাংলা কিংবা ইংরেজিতে নিয়ে পরে শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ চাকরির সুযোগ নেই। কিন্তু সাংবাদিকতা নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ রয়েছে। যারা শিক্ষার্থী হিসেবে অনেক ভালো, তাদের সাধারণত চাকরির অভাব হয় না। সমস্যায় পড়েন মাঝারি মানের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু মাঝারি মানের শিক্ষার্থীদের দেখা যায় বাড়তি অনেক গুণ রয়েছে যেগুলো অনেক ভালো শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেই। মাঝারি এমন শিক্ষার্থীরা মানুষের সাথে যোগাযোগে আগ্রহী হলে গণসংযোগ বিষয়ক পেশা বেছে নিতে পারেন এই বিষয়ে পড়ালেখা করে।
 
সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগ বিভাগে কীভাবে অধ্যনের সুযোগ রয়েছে এমন একটা প্রশ্ন বর্তমান উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের মনে উঁকি দিচ্ছে। সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগে স্নাতক বিষয় হিসেবে এখন খুবই জনপ্রিয়। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তির জন্য প্রতিবছরই শিক্ষার্থীদের লম্বা লাইন পড়ে। আর তাদের এই বিষয়ের ব্যাপ্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ভর্তির পূর্বে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে যোগাযোগের জন্য আহ্বান করেন অধ্যাপক মফিজুর রহমান।
 
বাংলাদেশে প্রায় বিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ অথবা সাংবাদিকতা ও মিডিয়া নামের ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যাট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিবারাল আর্টস বাংলাদেশ, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
 
সাংবাদিকতার ব্যাপ্তি সম্পর্কে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর গোলাম রহমান বলেন, ‘শুধু সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল নয়, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে অনলাইন সাংবাদিকতাও জনপ্রিয় মাধ্যম। পেশা হিসাবে সাংবাদিকতার ব্যাপ্তি প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইংরেজি ছাড়াও আঞ্চলিক ভাষাতেও সাংবাদিকতা করার বিস্তর সুযোগ রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে সংবাদমাধ্যমকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে হলে শুধু সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগ নিয়ে পড়ালেখা করাই যথেষ্ট নয়; সফল সাংবাদিক হতে গেলে চাই অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ।
 
তবে সাংবাদিকতায় অনার্স পড়লে এই পেশা সম্পর্কে কিছু ধারণা অবশ্যই তৈরি হয়। সাংবাদিকতা এবং গণযোগাযোগ অনার্স পড়লে মিডিয়া হাউজ ছাড়াও চাকরি জুটতে পারে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থা, পিআর এজেন্সি এমনকি ব্যাংকেও—এমনটাই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মফিজুর রহমান।
 
অনেক সময় ব্যাংকে চাকরি করতে গেলে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। যেমন—বিবিএ’র শিক্ষার্থীদের সাথে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের শিক্ষার্থীদের কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়; এমন প্রশ্ন করলে অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, ‘যারা সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ থেকে অনার্স শেষ করে তারা যে শুধু সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে তা নয়, এই শিক্ষার্থীরা পরিসংখ্যান, অর্থনীতিসহ সব ধরনের সাধারণ জ্ঞান লাভ করে থাকে। তাই অন্যান্য পেশায় গেলে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না এমটা নয়। তবে সেটা নির্ভর করে শিক্ষার্থীর নিজের দক্ষতা এবং যোগ্যতার ওপর।’
 
আজকের প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানিত সাংবাদিকদের অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে পড়ালেখা করে এসেছেন। ভালো সাংবাদিক হওয়ার জন্য সাংবাদিকতাই পড়তে হবে এমনটা জরুরি নয়। তবে বিষয়টি পড়া থাকলে একজনকে ভালো সাংবাদিক হতে তা অবশ্যই সাহায্য করে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমগুলো এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের পেশায় নিয়োগ দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে মনে করেন অধ্যাপক মফিজুর রহমান।
 
এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই বিভাগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আপনি লেখাপড়া করা অবস্থায় সাংবাদিকতা করতে পারবেন। পৃথিবীতে যোগাযোগের বিস্তর চাহিদা। তাই স্নাতক এবং মাস্টার্স শেষ করেই আপনি যোগাযোগের যেকোনো খাতে কাজ করতে পারবেন অনায়েসেই।’
 
শিক্ষক হওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ কি কাজে লাগতে পারে। এমন প্রশ্নের উত্তরে গোলাম রহমান বলেন, ‘সাংবাদিকতায় একটি তত্ত্ব পড়ানো হয়—ডিফিউশন ও ইনোভেশন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী প্রথমে অনুসন্ধান করতে হবে, কেন সরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোতে ছাত্র ভর্তি হচ্ছে না। তারপর উপযুক্ত পর্যালোচনা করে অ্যাডপশন তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। স্কুলের চারপাশে থাকে একটি কমিউনিটি, সেই কমিউনিটির উন্নতি কীভাবে ঘটানো যায়, তা দেখবেন প্রাথমিক শিক্ষক। তাতে পড়ুয়ারা বা তাদের অভিভাবকরা চাইবেন, কমিউনিটির সঙ্গে সঙ্গে স্কুলেরও উন্নতি হোক। এজন্য সাংবাদিকতার পাঠ নেওয়া শিক্ষক তার জনসংযোগ বিদ্যাকে কাজে লাগাবেন। সুতরাং এই বিষয় পড়ে একদম প্রাইমারী থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’
 
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের শিক্ষার্থী এবং ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের অনুসন্ধানী সাংবাদিক এনামুল হক এই বিষয়ে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, ভর্তির আগে জানতাম না, সাংবাদিকতায় পড়াশুনা করে অন্য পেশায় চাকরি করা যায় এমনকি লেখাপড়া চলাকালীন আপনি চাইলেই চাকরি করতে পারবেন। এই বিষয়ে পড়ালেখা করে প্রায় সব সেক্টরেই চাকরি করা যায়।’
 

সাংবাদিকতা পেশার উত্কর্ষ সাধনের জন্য যেমন সাংবাদিককে সুলিখিত বই পড়তে হবে তেমনি ব্যবহারিক জ্ঞানেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাই একজন সাংবাদিককে সত্, তীক্ষ বুদ্ধিসম্পন্ন, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, জ্ঞানী ও দক্ষ সাহসী প্রভৃতি গুণের অধিকারী হতে হয়।