পাবনা-সিরাজগঞ্জে দিনে ৮০ হাজার লিটার নকল দুধ!

রমজান মাসে তরল দুধের চাহিদা ও দাম বেড়েছে; কিন্তু বাড়েনি দুধের উত্পাদন। ফলে তরল দুধের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আর এই ঘাটতি পূরণে পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার লিটার নকল দুধ। নকল দুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ছানার পানি, স্কিমমিল্ক পাউডার, দুধের ননী, সয়াবিন তেল, হাইড্রোজ, লবণ, চিনি ও ফরমালিন।

 
স্বাধীনতার পর সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ীতে বড়াল নদীপাড়ে স্থাপন করা হয় দুগ্ধজাত পণ্য উত্পাদন কারখানা মিল্কভিটা। এর আওতায় ৩৫০টি দুগ্ধ সমবায় সমিতি রয়েছে। সমিতিতে গো-খামার রয়েছে প্রায় ১২ সহস াধিক। এসব সমিতি প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখ লিটার দুধ সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া দুইটি জেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গাভী পালন করা হয়। এসব গাভী থেকে আরো প্রায় এক থেকে সোয়া লাখ লিটার দুধ পাওয়া যায়। এই দুধ মিল্কভিটাসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ও ঘোষেরা ক্রয় করে থাকেন। এই দুগ্ধ অঞ্চলকে টার্গেট করে প্রাণ, আকিজ, আফতাব, ব্রাক ফুডস (আড়ং), আমো ফ্রেশ মিল্ক, কোয়ালিটি, বিক্রমপুরসহ বেশকিছু বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করতে এ অঞ্চলে তাদের আঞ্চলিক ও শাখা দুগ্ধ সংগ্রহশালা স্থাপন করেছে। এর ফলে তরল দুধের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকে। সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার তাদের জীবিকার পথ হিসেবে গাভী পালন ও দুধের ব্যবসা বেছে নিয়েছেন। ফলে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে হাজার হাজার গো-খামার।   
 
সিরাজগঞ্জ ও পাবনা প্রানিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে প্রতিদিন সাড়ে চার লাখ লিটার দুধের চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিন দুধ উত্পাদন হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ লিটার। এর মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার লিটার থেকে দেড় লাখ লিটার বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা, পৌনে দুই লাখ লিটার দুধ আফতাব, আকিজ, প্রাণ, আমো ফ্রেস মিল্ক, ব্রাকসহ বিভিন্ন বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, ঘোষরা ৫০ থেকে ৫৫ হাজার লিটার, দুই শতাধিক মিষ্টির দোকান ১৫ হাজার লিটার, হাট-বাজারে স্থানীয় ক্রেতারা প্রায় ১০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করে থাকেন। এ হিসেবে প্রতিদিন দুধের ঘাটতি পড়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার লিটার। আর রমজান মাসে দুধের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই ঘটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার লিটার। অসাধু ব্যবসায়ীরা ছানার পানি, ক্ষতিকর স্কিমমিল্ক পাউডার, ফরমালিন, বাটার অয়েল, সোডা, দুধের ননীসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করে দুধের এই ঘাটতি পূরণ করে থাকে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, সুজানগর, আটঘড়িয়া এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, বেলকুচি ও কাজীপুর উপজেলার ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা শতাধিক কারখানায় প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৪০০ মণ দুধের ছানা তৈরি করে। ওই পরিমাণ দুধে প্রায় ১১ হাজার ২০০ কেজি (২৮০ মণ) ছানা, চার হাজার ২০০ কেজি ফ্যাট এবং ৪০ হাজার ৬০০ লিটার ছানার পানি পাওয়া যায়। ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা ছানার পানি ফেলে না দিয়ে তা বড় বড় ড্রামে সংরক্ষণ করেন। পরে ওই ছানার পানির সাথে নানা উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করা হয় নকল দুধ। প্রতিটি কারখানায় সবসময় দুই থেকে পাঁচ হাজার লিটার ছানার পানি মজুদ রাখা হয়।   
 
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, এ অঞ্চলের শতাধিক ছানা কারখানার ছানার পানিই নকল দুধ তৈরির প্রধান উপকরণ। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও ঘোষ প্রতি মণ ছানার পানিতে আধা কেজি ননী, আধা কেজি মিল্ক পাউডার সামান্য পরিমাণ লবণ, খাবার সোডা, এক কেজি চিনি ও দুধের কৃত্রিম সুগন্ধি মিশিয়ে অবিকল দুধ তৈরি করছে, যা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া আসল না নকল বোঝার উপায় থাকে না। ঘোষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই নকল দুধ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা পাঠিয়ে দেন দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে। পরে প্রক্রিয়াজাত করার সময় নকল দুধের সাথে আসল দুধ মিশে সব দুধই ভেজালে পরিণত হয়। ব্যবসায়ীরা দুধ ‘তাজা’ রাখতে ফরমালিন ব্যবহার করছেন। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় আসল দুধ থেকে শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ফ্যাট (ননী) বের করে নেয়া হয়। এতে দুধের পুষ্টিমাণ কমে যায়। এ দুধ কিনে ক্রেতাসাধারণ প্রতারিত এবং নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
 
ছানার পানি ছাড়াও অন্য এক পদ্ধতিতে অসাধু ঘোষ ও ব্যবসায়ীরা নকল দুধ তৈরি করছেন। এক মণ ফুটন্ত পানিতে এক কেজি দুধের ননী, আধা কেজি মিল্ক পাউডার, কয়েক ফোঁটা বাটার অয়েল, ২৫০ গ্রাম হাইড্রোজ সমপরিমাণ লবণ, ১০০ গ্রাম সয়াবিন তেল ও এক ফোঁটা ফরমালিন মিশিয়ে নকল দুধ তৈরি করা হয়। ক্ষতিকর মিল্ক পাউডার ভারত থেকে সীমান্তপথে দেশে প্রবেশ করছে। সূত্র জানায়, দুধের ল্যাকটো ও ঘনত্ব নির্ণয়ে ল্যাকটোমিটার ব্যবহার করে ভেজাল শনাক্ত করা যায় বলে নকল দুধে চিনি, লবণ, হাইড্রোজ ও সয়াবিন তেল ব্যবহার করে। এতে দুধের ঘনত্ব ও ল্যাকটো বেড়ে যায়। দুধ তাজা রাখার জন্য দেয়া হয় ফরমালিন। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা কালে ল্যাকটোমিটার দিয়ে এই সূক্ষ্ম প্রতারণা ধরা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্টরা নকল দুধ তৈরি ও বাজারজাতকরণের কথা অস্বীকার করেছেন।
 

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের সহকারী অধ্যাপক মেডিসিন বিশেজ্ঞ ডা. শামীম হোসাইন জানান, দীর্ঘদিন ধরে কেমিক্যাল মিশ্রিত দুধ পান করলে মানব দেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। ফরমালিন মেশানোর ফলে হেপাটোটক্সিকিটি বা লিভার রোগ, কিডনি রোগ, ক্ষতিকর মিল্ক পাউডারের ফলে মানবদেহে হাড়ের মধ্যকার দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে। এরফলে শরীরের পিছনের অংশে ব্যথা অনুভব, চর্মরোগ, হজমে সমস্যা, পেটের পীড়াসহ নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে।