তত্ত্বাবধায়ক দাবি থেকে সরে আসছে বিএনপি!

বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা, উদ্ভূত রাজনৈতিক বাস্তবতা, আঞ্চলিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট ও দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নির্বাচনকালীন ‘নির্দলীয়-নিরপেক্ষ’ বা ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার পদ্ধতির দাবি থেকে সরে আসার বিষয়ে সক্রিয় চিন্তা-ভাবনা চলছে বিএনপিতে। তত্ত্বাবধায়কের বদলে ‘যে কোনো ব্যবস্থা’য় সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দেশে ও আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি আদায়কেই প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। ‘সংশোধিত’ এই দাবি আদায়ে নতুন করে আন্দোলনে যাওয়ার আগে দল গুছানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গুছানোর এই উদ্যোগে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটি’তেও পুনর্গঠন আসছে বলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

 
পরবর্তী আন্দোলনের আগে দল পুনর্গঠনের কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই। শনিবার রোজার ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময়ের ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপির নামে শুধু মামলা আর মামলা। আমাদের অনেক নেতা-কর্মী জেলে আছে। কত ছেলে যে গুম হয়েছে, তার হিসাব নেই। কাজেই বিএনপিকে এখন পুনর্গঠন করতে হবে। এরপর আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করব।’
 
নতুন করে আন্দোলনে যাওয়ার আগে দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি এতদিনের ‘নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন’-এর দাবিতেও সংস্কার এনে বাস্তবভিত্তিক এক দফার কর্মসূচিতে যাওয়ার বিষয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের প্রাথমিক ধারণা দিয়েছেন খালেদা জিয়া। সম্প্রতি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দাবিটিকে জনগণের কাছে আরও পরিষ্কার ও বাস্তবধর্মী করতে হবে, যেন দাবির পক্ষে ব্যাপকভিত্তিক জনমত গড়ে ওঠে।’ ওই বৈঠকে থাকা দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য এবং একজন ভাইস চেয়ারম্যান ইত্তেফাককে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
 
তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে সরে আসার চিন্তা-ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক তো মূল সমস্যা নয়। আমরা চাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেই নির্বাচনটি যেন সবার অংশগ্রহণে এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেটিই মূল কথা। আমাদের মূল দাবিও তাই।’
 
এ প্রসঙ্গে বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা আরও বলেন, ‘সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচন কীভাবে করা যায়, সেই প্রক্রিয়া বের করতে দরকার আলাপ-আলোচনা বা সংলাপ। সংলাপের মধ্য দিয়ে এই ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছানো গেলেই সংকটের সমাধান মিলবে।’
 
বিএনপির নীতিনির্ধারণী একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, নির্বাচনকালীন অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে ক্ষমতাসীনদের সম্মত করতে পারার আশা নেই বললেই চলে। বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয়ও একদিনের জন্যও অনির্বাচিত সরকার ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়নি। এছাড়া এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতেও যে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী অবস্থান এবং নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে, সেটিকেও সক্রিয় বিবেচনায় নিচ্ছে বিএনপি নেতৃত্ব। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক নয়, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়কেই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। দলটির বিশ্বাস, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে এবং ফল ঘোষণায় অনিয়ম না হলে সরকার পরিবর্তন সম্ভব।
 
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক তো আমাদের দাবির মূল ফোকাস নয়। জনগণ যেন তাদের ভোটাধিকার ফিরে পায়, সবার অংশগ্রহণে যেন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়– সেটিই আমাদের দাবি। যদি তত্ত্বাবধায়কের বিকল্প কোনো ব্যবস্থায়ও এটি সম্ভব হয়, তা হলে সমস্যা কী।’
 
সূত্রমতে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান শনিবার ঈদের রাতে তার গুলশানের বাসায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সম্মানে যে নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন সেখানেও বিএনপির নতুন চিন্তা-ভাবনা এবং সামগ্রিক রাজনীতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই নৈশভোজে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট, রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্দার নিকোলায়েভ, চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন, কানাডার রাষ্ট্রদূত বেনওয়া পিয়েরে লাঘামে ছাড়াও নেদারল্যান্ডস, কোরিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের কূটনীতিকরা যোগ দেন।
 
এদিকে নির্বাচন প্রশ্নে সম্ভাব্য সংস্কারকৃত দাবি আদায়ে পরবর্তী আন্দোলন যেন আর ব্যর্থ না হয় এবং দলে নতুন গতি সঞ্চার করার লক্ষ্যে বিএনপির সর্বস্তরে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটিতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। জানা গেছে, বয়সের ভারে দুর্বল, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে নিষ্ক্রিয় এবং অবিশ্বস্তদের স্থায়ী কমিটি থেকে বাদ দেয়া হতে পারে। এই তালিকায় চার থেকে পাঁচজনের নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আপিল বিভাগের রায় হওয়ার কথা রয়েছে আগামী ২৯ জুলাই। তিনি চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তার পদ খালি হবে। সবমিলিয়ে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় স্থায়ী কমিটিতে কয়েকজন নতুন মুখ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদ, ভাইস-চেয়ারম্যান, যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হতে পারে।
 
এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন ‘দল গুছিয়ে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সঠিক নেতৃত্ব আনতে পারাই এখন আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা পরিচ্ছন্ন, মেধাসম্পন্ন, বুদ্ধিদীপ্ত, ত্যাগী ও সাংগঠনিক দক্ষ নেতৃত্বের অভাবেই আমাদের আন্দোলন বারবার মার খাচ্ছে। সর্বস্তরেই জিয়াউর রহমানের আদর্শের এবং অপেক্ষাকৃত তরুণ এই ধরনের যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।’ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, নানা কারণে এতদিন দল গুছানোর সুযোগ ছিল না, নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এখন দলকে গুছিয়ে তারপর বিএনপি আন্দোলনে যাবে।
 

সূত্রমতে, সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে এবং একক সাক্ষাতেও দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কেউ কেউ তাকে বলেছেন-আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়নসহ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতাদের সমন্বিত মতামতকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। জানুয়ারি থেকে তিন মাসের আন্দোলনসহ এর আগে-পরেও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় নেতারা উপেক্ষিত হয়েছেন জানিয়ে তারা দলের প্রধানকে এ-ও বলেছেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় নেতাদের চেয়ে গুলশান কার্যালয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তা বেশি প্রাধান্য পেয়েছেন, যা আন্দোলন সফল না হওয়ার একটি কারণ। জানা গেছে, দলের নেতাদের এই পরামর্শ গ্রহণ করেছেন খালেদা জিয়া। এখন থেকে বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে স্থায়ী কমিটির নিয়মিত বৈঠক ডেকে মতামত নেয়া হবে বলে তিনি দলের নেতাদের আশ্বস্ত করেছেন।