মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ‘ভয়ঙ্কর’ যান বলে আসছেন পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে তারা করিমন, নসিমন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পাশাপাশি সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তারা বলছেন, মহাসড়কে অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এ অবস্থায় গতকাল বুধবার দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোতে সব ধরনের অটোরিকশা চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানা গেছে, সারাদেশে জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ৩ হাজার ৫৮০ কিলোমিটার। আর মহাসড়কের মধ্যে দেশের পাঁচটি জেলা সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ। এগুলো হচ্ছে— কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা।
একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে গত বছর হাইকোর্ট দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ১০ জেলার মহাসড়কে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার বাহন নসিমন, করিমন, ভটভটি না চালানোর নির্দেশ দেয়। পরে সরকারও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর ফলে মহাসড়কে এ ধরনের যান চলাচল কিছুটা কমে যায়। কিন্তু গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অটোরিকশা দুর্ঘটনা বেড়ে গেলে বিষয়টি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
গতকাল সচিবালয়ে ঈদ যাত্রায় সড়কের পরিস্থিতি নিয়ে ‘মনিটরিং টিমের’ সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলতে পারবে না, এ মর্মে সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার উদ্যোগী হওয়ায় মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নসিমন-করিমন চলাচল কমে গেছে। নতুন উপসর্গ মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অতীতে এত সিএনজি অটোরিকশা ছিল না, এ সকল অটোরিকশা ঘটাচ্ছে দুর্ঘটনা।
কবে নাগাদ মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটু সময় লাগবে। সবাইকে এ ব্যাপারে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, সরকার ধাপে ধাপে দেশের সকল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী সেপ্টেম্বরে জয়দেবপুর-এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করার ভৌত কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে বনপাড়া-হাটিকুমরুল সড়কও চার লেনে উন্নীত করা হবে।
বাংলাদেশ বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শ্যামলী পরিবহনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রমেশ চন্দ্র ঘোষ বলেন, দেরিতে হলেও মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বন্ধ করায় আমরা সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, মহাসড়কে সিএনজি অটোরিকশা একটি ভয়ঙ্কর যান। যারা এক সময় রিকশা চালাতেন তাদের অনেকেই ট্রেনিং ছাড়াই এসব চালাচ্ছেন। রিকশা থেকে প্রমোশন নিয়ে অটোরিকশা চালক বনে গেছেন তারা। ড্রাইভিংয়ের ন্যূনতম ধারণা না থাকার পরও দেশের মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়কে ড্রাইভিং করছে তারা। তাদের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছিল মহাসড়কের অটোরিকশা, নসিমন-করিমন বন্ধ করার জন্য। এসব যানবাহনের কারণে প্রায় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, শুধু নিধেধাজ্ঞা জারি করলেই হবে না। এগুলো যাতে মহাসড়কে উঠতে না পারে সে জন্য কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
ঈদের ছুটির মধ্যে গত ২০ জুলাই রাতে সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় সংযোগ মহাসড়কে বাসচাপায় অটোরিকশার পাঁচ আরোহীর মৃত্যু হয়। ঈদের পরদিন ভোরে একই স্থানে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৭ জন নিহত ও অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়। এর আগে গত ১৭ জুলাই মুন্সীগঞ্জে বাস-অটোরিকশা সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। আগের দিন কিশোরগঞ্জে ট্রাক্টরের চাপায় প্রাণ হারান অটোরিকশার তিন যাত্রী। একই দিনে আখাউড়ায় মাইক্রোবাসের ধাক্কায় অটোরিকশা খালে পড়ে মারা যান তিন জন। গত ১৫ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে পিকআপ ভ্যান- অটোরিকশা সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হন। সভা শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা এবং তাদের কর্মস্থলে ফেরার পথ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক নির্বিঘ্ন ছিল। তবে এবার প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারিয়েছে। গত বছর ৯০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু এতে স্বস্তির কোনো কারণ নেই, প্রতিটি মৃত্যুই অপূরণীয় ক্ষতি, এসব ঘটনা বেদনাদায়ক।
তিনি বলেন, এবারের ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী ঈদে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। আসন্ন ঈদুল আজহার প্রস্তুতিও আমরা শুরু করতে যাচ্ছি। তিনি জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর ও আশপাশে কোরবানির পশুর হাট না বসানোর বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানান।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে সড়কের কোনো সমস্যা ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টরা আমাকে জানিয়েছেন, বেপরোয়া গাড়ি চালানোই দুর্ঘটনার কারণ।
তারপরও তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে চারটি ‘দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পটে’ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আদলে আগামী দুই মাসের মধ্যে ডিভাইডার বসানো হবে বলে জানান কাদের।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএএন ছিদ্দিক, সওজের প্রধান প্রকৌশলী ফিরোজ ইকবাল, বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান, ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মো. কায়কোবাদ হোসেনসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।